আগুণ




নতুন বাসা নিয়েছি। ঢাকায় গাছপালায় ঘেরা বাসা পেতে হলে অবশ্যিই শহরের এক কোণায় যেতে হবে। আমি প্রকৃতি প্রেমী না। তবুও কেন যেন গ্রীন মডেল টাউনে একদিন ঘুরতে গিয়ে জায়গাটা পছন্দ করে ফেললাম এবং পরের মাসেই উঠে গেলাম।

এত নিরিবিলি পরিবেশ আমার গ্রামেও নেই। এখন গ্রামের বাজারেও দুপুরের ঘুম কিংবা রাতের সময় দুই পেয়ারের সাউন্ড বক্সে ইংরেজী গান বাজিয়ে রাখে। মাঝেমধ্যে মুড চেঞ্জ হলে তারা হিন্দি গানও বাজায়। বাংলা গানে বোধহয় রুচি নেই তাদের, একটু বেশিই আধুনিক।
আমার এখানে এই ঝামেলা নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠলে পাখির কিচির মিচির আর বাতাসের শো শো আওয়াজ, রাতে ঘুমাতে গেলে ব্যাঙ্গের কান্নার আওয়াজ । একদম প্রাকৃতিক ।
সমস্যা হলো অফিসে যাবার সময় অনেকটা হেটে যেতে হয়, আসার সময়ও একিই অবস্থা। যদিও হাটাটা উপভোগ করি আমি। রাস্তার দুইপাশে গাছে ঘেরা, আশেপাশে কোন দোকান নেই। ভাগ করা প্লটগুলোতে সবজির চাষ করা, দুই এক রোড পরপর একটা বাসা।
অফিস থেকে ফেরার সময় হাটতে হাটতে আর গুনগুন করে গান গাই। গুনগুন করে না, একটু জোরেই । আশেপাশে কেউ না থাকলে এই এক সুবিধা। কেউ আমার ভাঙ্গা গলা শুনে ভ্রূ কুচকানোর সুযোগ নেই।
আজও একিইভাবে "যেখানে সীমান্ত তোমার" গানটা গাইছিলাম। কুমার বিশ্বজিতের এই গান আমার খুব প্রিয়। তখনি পেছন থেকে প্রায় আমার সমবয়সী এক যুবক বললেন,
- হাঁটার সময় গান না গেয়ে ছোট ছোট আমল করতে পারেন।
চাপ দাঁড়ি আর পরিষ্কার সাদা পাঞ্জাবী পড়া মানুষটাকে দেখে আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম । আমি নিজেও প্রায় এই কাজ করি। হাঁটতে গেলে "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়া আমার অভ্যাস ছিল। সমস্যা হলো এই পরিবেশে প্রায় আমি গান ধরে ফেলি।
-আসলে মনটা ভালো লাগে এই জায়গায় হাঁটলে ।
- অহ। বাসা কোথায় ?
- ৮ নাম্বার রোডে।
- ৮ নাম্বার রোডে কত নাম্বার বাসা ?
- ৫০ নম্বর।
- আরেহ ! আমার বাসাও। কয় তালায় থাকেন ?
- সাত তলায়। আপনি ?
- আমি চারতলার। নিজেদের ফ্ল্যাট। আমার নাম সোয়েব। সোয়েব মজুমদার। এমবিএ করেছি অষ্ট্রেলিয়া থেকে। মোনাস ইউনিভার্সিটি।
- আচ্ছা। আমি সাখাওয়াত। চারদিন হলো ভাড়া নিয়েছি ।
- অহ । সেলিম সাহেবের ফ্ল্যাটে ?
- জ্বী।
- সাবধানে থাইকেন ভাই। সেলিম সাহেব মানুষ ভালো না।
- হুম। আমি কথা বাড়ালাম না। সমালোচনা করা আমার পছন্দ না।
- হুম না ভাই। সাবধান করলাম । সে একটা আগুন, এই আগুন থেকে দূরে থাকা ভালো।
- ভাই কি বাসায় যাবেন এখন ? আমি কথা অন্যদিকে নিতে চাইলাম।
- নাহ। আপনি যান। পরে দেখা হবে।
আমি দ্রুত পা চালিয়ে চলে আসলাম। অযথা গেঞ্জামে যাওয়া কি দরকার। সেও ফ্ল্যাটের মালিক, সেলিম সাহেবও মালিক। আমি চুপচাপ থাকাই ভালো ।
মনের মধ্যে বিরক্ত চলে আসলো । গানটা আবার ধরতে চাইলাম, আসছে না। বিরক্ত লাগছে । বাসায় ঢুকতেই দাড়োয়ান বললো,
- অফাইয়ের বিল দেন। লোক আইসা লাইন দিয়া গেছে ।
আমি পকেট থেকে ওয়াইফাইয়ের বিলের জন্য আলাদা করে রাখা টাকা বের করে দাড়োয়ানকে দিলাম ।
- সিদ্দিক ভাই নেন অফাইয়ের বিল।
- ময়লার বিলটাও মাসের পথথমে দেওন লাগে।
- আচ্ছা দিব। সিদ্দিক ভাই, ছাদে কাপড় শুকানো যাবে ?
- না ভাই, ছাদে যাওন নিষেধ। সোয়েব ভাই মরনের পর ছাদ বন্ধ । বিদেশ থেকা পড়ালেখা কইরা আসা মানুষ, কি ভালা ব্যবহার। গেল সপ্তাহে ছাদের উপর চুচাইড করছে। এরপর থেইকা ছাদে যাওন মানা।
আমি থতমত খেয়েছি। কার কথা বলছে সিদ্দিক ভাই। এরমধ্যে সে তার পাশে থাকা টেবিলের নিচ থেকে একটা পত্রিকা বের করে সাদা কালো ছবি দেখিয়ে বললো,
- আমগো সোয়েব ভাই।
এই মানুষটা কিছুক্ষন আগে আমাকে উপদেশ দিয়ে গেলো, আমল করতে বললো, আমার ফ্ল্যাটের মালিক সেলিম সাহেব থেকে সাবধান থাকতে বললো।
- কিভাবে মরলেন তিনি ?
- গায়ে কেরোশিন দিছে । পুরা শরীর পুইড়া ছাই।
- কেন করলেন এই কাজ ?
- হেইডা জানিনা। মরন আইছে, মরনের লাইগা উছিলা দরকার। উছিলা হইলো কেরোশিন ।
আমি মাথায় ঘোর নিয়ে হাঁটছি, সিড়িটা খুজে পাচ্ছিনা, লিফটাও খুজে পাচ্ছিনা। আচ্ছা সোয়েব মজুমদার আমাকে সেলিম সাহেব থেকে কেন সাবধান হতে বললেন ?
সেলিম সাহেবের নাম কেন 'আগুন' রাখলেন তিনি !
Best Blog in Bangladesh

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ