![]() |
| ভয় |
নামঃ শামসুর নাহার। কাছের মানুষ ডাকে পুতুল বলে ক্লাস টেনের মেধাবী ছাত্রী। ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত কেউ তাকে রোল নাম্বার এক থেকে সরাতে পারেনি। ক্লাস এইটে থাকা অবস্থায় তাঁর ইংরেজী শিক্ষক ঘোষনা দিয়েছিলেন পুতুলের খাতা চোখ বন্ধ করে কাটলেও সমস্যা হয়না। তাদের স্কুল এমনিতে নাম করা, সেই নাম করা স্কুলের নাম করা শীক্ষার্থী পুতুল। ষোল বছর বয়সী এই কিশোরীর জীবনে একটাই দুঃখ । সেটা তার নাম ।
মানুষের জীবনে দুঃখ থাকে প্রেমে ব্যার্থ হবার, সময় মত বেতন না পেয়ে বাড়িওয়ালা থেকে লুকিয়ে থাকার, স্থানীয় চাঁদাবাজের ভয়ে বাড়ি বানাতে না পারার। আর পুতুলের দুঃখ হল তাঁর নাম । তার জীবনের সখ হল নামটা পাল্টাবে । এই কাজটা এখন করা যাবে না । এখন করলে তার স্কুলের বান্ধবীরা আরো বেশি করে রাগাবে, এমনিতে শামসু ভাই বলে কম রাগানো হয় না । কাজটা করতে হবে এসএসসি পরিক্ষার পর, আগামী বছর। কলেজে ভর্তি হবার আগে, নতুন জায়গায় নতুন নাম নিয়ে যাবে;
ব্যাস, সমস্যার সমাধান ।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হল, তার ঘনিষ্ট বান্ধবীরা বলেছে, বিয়ের পর তার স্বামী তাকে পুতুল বলে ডাকবে না । শামসু ভাই বলে সম্ভোধন করবে । কি ভয়ংকর, তাঁর স্বামী সকালে ঘুম থেকে উঠে বলবে,
-শামসু ভাই এক কাপ চা দাও ত ।
এই সুযোগ দেয়া যাবে না। সে নাম পাল্টাবেই । কাজটা একটু গোপনে করতে হবে, পরিক্ষা শেষে দুই তিনজন এতিম ডেকে শুধু মাত্র বাবা-মা’কে স্বাক্ষী রেখে কাজটা করাবে । অবশ্য রাখার মতন পরিবারে আর কেউ নেই । সে পরিবারের একমাত্র মেয়ে ।বাবা-মায়ের রাজকন্যা ।
সাধারণত রাজকন্যাদের কোন রুটিন থাকেনা, ‘আমরা যা খুশি তাই করি’ টাইপ মনভাব হয়। এই রাজকন্যা অন্যদের চেয়ে একেবারে আলাদা ।তার রুটিন শুরু হয় সকালে ফজর নামাজ পড়ে। নামাজ পড়ে আবার লাফ দিয়ে কম্বলে ঢুকেনা, তার চারটা ফুল গাছের টব আছে। এক ঘন্টা গাছগুলোর পিছনে সময় যায় ।
চারটা ফুল গাছের নাম আলাদা; গোলাপ, জবা, গন্ধরাজ আর টাইম ফুল ।এই চারটা ফুলের মধ্যে টাইম ফুলটা একটু আজব । এর বৈজ্ঞানিক নাম- Portulaca grandiflora । ঠিক নয়টা বাজে ফুটে বলে এটাকে পুতুল মজা করে অফিস ফুল নাম দিয়েছে । তাঁর বাবা প্রতিদিন সকাল নয়টায় অফিস যাবে, ফুলটাও ঠিক নয়টা বাঝে ফুটবে। অফিস ফুল আজব হলেও এটা তার পছন্দের ফুল না, তার পছন্দের ফুলের নাম হল গন্ধরাজ ।
পছন্দ বলেই হয়ত এই গাছটা একটু বেশি যত্ন পায়। পুতুলের রুমে কোন এয়ার ফ্রেশনারের প্রয়োজন হয়না, গন্ধরাজের ঘ্রাণে সারাক্ষন স্বর্গ করে রাখে । পুতুল টাইম মত স্কুলে যায়, নিজে নিজের কাপড় ধৌয়, আয়রন করে, মাঝেমধ্যে খাবার বানানো শিখে। তাঁর সখ কিছুদিন পরপর চেঞ্জ হয়। কখনো কবিতা লিখবে, কখনো ছবি আঁকবে, দুই দিন পর ইচ্ছে হলে ছবি তুলবে। পুতুলের ইদানীং শখ জেগেছে বেহালা বাজানো শিখবে। কিন্তু, বাদ্য-বাজনা নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছেন তাঁর বাবা। বাবা নিষিদ্ধ বলেছেন মানে নিষিদ্ধ, পুতুল সেই জিনিস যতই পছন্দ হোক ফিরে তাকাবে না ।
পুতুলের আরেকটা অভ্যাস আছে । হাসি । কারনে হাসি, অকারনে হাসি। তার বাবা বলে এই হাসি রাজকন্যাদের হাসি। পৃথীবিতে রাজকন্যারা শুধু এত সুন্দর হাসতে পারে। এ ব্যাপারে অবশ্য তার মা একটু আলাদা । তার মায়ের কথা হল, বেশি হাসা ঠিক না।
-‘বেশি হাসলে ফেরেশতারা পছন্দ করে না। এরা খোদার কাছে গিয়ে খারাপ রিপোর্ট করে, খোদা তখন কষ্ট দিয়ে দেয়।‘
যুক্তিটা পুতুলের ভাল লাগেনি । ফেরশতারা মানুষ না। এরা নূরের তৈরী। এদের মনে আবেগ হিংসা থাকার কথা না। হিংসে থাকবে মানুষের মনে, এটা মানুষের কাজ। মানুষ হিংসের কারনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ করেছে, বাকি আছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ফেরেশতাদের কাজ খোদার দেয়া কাজ ঠিকভাবে শেষ করা, টাইম ফুলের মতন সময়ের মধ্যেই। তাও আবার এক ফেরেশতাকে সব কাজ দেয়া হয়না। একেক ফেরেশতার একেক কাজ। যেমন; মালাকুন মউতের কাজ মানুষের জান কবচ করা, উনি ত আর কিরামানের কাজ করবে না। আর কিরামানের কাজ হল ডান কাধে বসে মানুষের ভাল কাজের হিসেব রাখা, সে ত আর কাতিবিনের কাজ করবে না।
আজগুবী চিন্তা ।
সেলিম সাহেব আনন্দ মুখ নিয়ে বসে আছে। বউকে নিয়ে মার্কেটে আসলে আনন্দ মুখ থাকার কথা না। কয়েকটা ব্যাগ হাতে নিয়ে বিষণ্ণ মুখ নিয়ে থাকার কথা। তিনি বউকে নিয়েই এসেছেন এবং খুবই আনন্দিত। তার বউ বলেছে একটা জামা নিবে শুধু মেয়ের জন্য। পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী একটা জামা নিতে কমপক্ষে দুইঘন্টা লাগার কথা । এর ফাকে কসমেটিক্স কিছু। হাটতে হাটতে অনেক কিছুই পছন্দ হয়ে যাবে মেয়েদের, এটা মেনে নিতে হয় সব স্বামীদের । সেলিম সাহেবের বউ আপাতত একটা কসমেটিক্স দোকানে টিপ দেখছে। একটা লাল ত্রিভুজ টিপ পড়ে আয়নায় তাকিয়ে আছে । এখন আপাতত ভাল লাগছে, দুই মিনিট পর আর ভাল লাগবে না, এরপর খয়েরী টিপ পড়বে।
সেলিম সাহেবের এসব মুখস্থ।
তিনি মার্কেটে এসে ফুড কর্নারে বসে থাকেন। এরমধ্যে বউ যা কেনার করে আসে। বসে থাকাটাও বিরক্তকির। তবু তিনি আনন্দিত কারন কাল তার মেয়ের জন্মদিন । প্রত্যেকবারের তিনি তার বউয়ের কাছে হারেন মেয়েকে উপহার নিয়ে। সবসময় তার বউ মেয়ের সবচেয়ে পছন্দনীয় উপহার নিয়ে যায়। মা বলে একটু সুবিধা পায়, মেয়ের পছন্দ সব মুখস্থ।
সেলিম সাহেব এবার হারবেন না, তাই অফিসের কলিগদের সাথে আলোচনা করে একটা বেহালা নিয়েছেন । মেয়ে অনেকদিন ধরে আবদার করছিল, কিন্তু বাদ্য বাজনা সেলিম সাহেবের পছন্দ না। তিনিও কলেজে পড়ার সময় গিটার শিখতে চেয়েছিলেন। তার বাবা ঘোষনা দিয়েছিলেন বাদ্য বাজানো ছেলের জায়গা বাজারে, তার ঘরে
না। তার সখের কবর হয়েছিল সেখানেই ।
তিনিও কবর দিতে চেয়েছিলেন মেয়ের সখকে, কিন্তু, মন অশান্তি করছে। একটা মাত্র মেয়ে, বেকার অবস্থায় এই মেয়ের মা তার ঘরে উঠে। চাকরি হবার আগেই মেয়ে পেটে আসে, তার মাথায় হাত। জমানো টাকা নেই, কিভাবে এই মেয়েকে পৃথীবিতে আনবেন? এই মেয়ে যেদিন জন্মেছিল সেদিন তিনি দুইটা বড় সুখের সংবাদ পেয়েছিলেন। প্রথম, তার চাকরি হয়েছিল। ভুমি অফিসের চাকরি তখন সোনার হরিণ ছিল, সেই সোনার হরিণ তার কাছে এসেছিল রাজকন্যার সাথে। দ্বিতীয়, তার শ্বশুর সেদিন প্রথম বাসায় এসেছিলেন। এতদিনের রাগ ভুলে সেলিম সাহেবকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, ‘জামাই আমার নাতীরে দেখ, আমার পুতুল নাতী হইছে, পুতুলের মতন’।
মেয়ের নাম রাখা হল পুতুল ।
সেলিম সাহেবের আনন্দ মুখ নিয়ে পা দোলানো দেখে জাহানারা বেগম একটু চিন্তিত । উনার স্বামী সবসময় মেয়ের জন্মদিনের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করতে চায়, এবার নিশ্চই বড় কিছু প্রোগ্রাম করে রেখেছে । তিনি খুবই চিন্তিত । চিন্তিত মুখ নিয়েই ঘুরছেন মার্কেটে, কিছুই ঠিকভাবে পছন্দ হচ্ছেনা। এক ঘন্টা হয়ে গেল, কি নিবেন এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না । হঠাত মনে হল, পুতুল ছবি তোলা খুব পছন্দ করে, একটা ভাল ক্যামেরা নেয়া যেতে পারে। ক্যামেরার দাম একটু বেশী পরবে, সমস্যা নেই।
তাঁর জমানো কিছু টাকা আছে, সেগুলো ভাঙবেন । তাঁর পছন্দের জামদানী শাড়িটা বোধহয় আর নেয়া হবেনা। তবুও এখন শান্ত লাগছে তাঁর । তাঁর মেয়ে তাঁর কাছে সবকিছু। এবার তিনি নিশ্চিত তার স্বামী এবারো হারবে। তিনি ইলেক্টনিক্স দোকানে গিয়ে সেখান থেকে একটা ভাল ক্যামেরা নিলেন এবং ক্যামেরার ব্যাগ কাপড়ের ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে স্বামী যেখানে বসে আছে সেইদিকে হাটা দিলেন।
পুতুল ইদানীং নতুন সখ পেয়েছে । কবিতা লিখা। তার বান্ধবীরা বলছে সে প্রেমে পড়েছে। অসম্ভব কথা, সে নিশ্চিত এইসব বাজে কাজ তার দ্বারা হবেনা । মা বলেছেন প্রেম খারাপ ব্যাপার, আর খারাপ কাজ থেকে মানুষকে দূরে থাকতে হয় । পুতুল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, নিয়ম করে কোরান পড়ে, সে কেন প্রেমে পরবে? বান্ধবীরা সবসময় নোংরা কথা বলবেই । সবচেয়ে বেশি বলে আফসানা মেয়েটা, এর কাজ হচ্ছে সারাক্ষন ছেলেদের নিয়ে আলোচনা করা। সেদিন ভয়ংকর একটা তথ্য দিয়েছিল সে, তার নাকি খুব ইচ্ছে কোন ছেলে তাকে অপহরণ করবে। কি আজব! এধরনের ইচ্ছে কেন হবে? পুতুলের ধারনা তার বান্ধবী আফসানা অসুস্থ ।
মানসিক ভাবে অসুস্থ ।
এই ক্ষেত্রে নুজাত আলাদা। সে রুক্ষ মেয়ে। রুক্ষ হলেও তাকে পুতুলের ভাল লাগে। তার ধারনা ছিল না মেয়ে মানুষ এত রুক্ষ হতে পারে। তার বাবা সেলিম সাহেব পুরুষ মানুষ হয়েও এতটা রুক্ষ না। নুজাতের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হল, রাস্তায় উলটাপালটা কোন মন্তব্য হলেই চিল্লাচিল্লি শুরু করবে। ব্যাপারটা পুতুলের লজ্জা লাগে, মেয়ে মানুষ কেন রাস্তায় চিল্লাবে ! মেয়ে মানুষের গলার স্বর হবে নরম, নিচু । পুতুলের ধারনা খোদা তাকে মেয়ে মানুষ হিসেবেই বানিয়েছেন, কিন্তু কলিজাটা দিয়ে দিয়েছেন ছেলেদের। আর যেই ছেলের সাথে কলিজা বদল হয়েছিল সে হল নুজাতের বড় ভাই। ভীতুর ডিম । নুজাত তার নাম দিয়েছে বেকুব। নুজাতের বাবা আরেকটু বড় নাম দিয়েছেন;
বেকুবের হাড্ডি ।
হাসনাত ।সাদাসিদে নাম, মানুষটা নিজেও সাদাসিদে। লেখাপড়ায় মোটামোটি, এই মোটামোটি লিখাপড়া দিয়ে এখন বিবিএ লাস্ট সেমিস্টারে আছে । প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়লেও এখনো ফুলহাতা শার্টের হাতা নামানো থাকে, চুল সোঝা করে আচড়ানো । রাস্তায় হাটলে মনে হয় ক্লাস ওয়ানের কোন বাচ্চাকে মা এই মাত্র চুল আঁচড়িয়ে স্কুলে পাঠিয়েছে । ইউনিভার্সিটির শেষ সেমিস্টারে এসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে চাকরি করবে । বাবার ব্যাবসা তাকে দিয়ে হবে না । ব্যাবসা করতে সাহস লাগে, আর রেস্টুরেন্টের ব্যবসায় আরো সাহসী হতে হয়। কথায় কথায় বাবুর্চী আর ওয়েটারদের তার বাবার মত করে দরাজ গলায় ধমকের উপর রাখতে হয়। তার ধারনা সে ব্যাবসায় বসলে বাবুর্চী আর কর্মচারীরা তার বাবার উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তাকেই ধমকাবে ।
বিশ্রী অবস্থা
এরচেয়ে ভাল ব্যাবসাটা তার বোন করবে। সাহসী মেয়ে। নাম নুজাত। নাম মিষ্টি হলেও মেয়ে একদম বাবার মতন ভয়ংকর। হাসনাতের সাথে কেউ ঝগড়া করলে ছোট বোন একাই যথেষ্ট শাসন করার জন্য। গলার স্বরে ওজন আছে, সবাই ভয় পায়। হাসনাত নিজেও ভয় পায়। তাই ছোট বোনকে সমীহ করে চলে। দুনিয়াতে হাসনাতকে একমাত্র বুঝতে পারে তাঁর মা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর নাম দেয়া হয়েছে টমেটো। হাসনাত ব্যাপারটা নিয়ে রাগ করেনা, তাঁর মা তাকে যাই বলুক সেটাই সুন্দর। তাঁর কেন জানি মনে হয় তাঁর বউ তাকে টমেটো বলে ডাকবে। মেয়েরা এসব সহজে ধরতে পারে, শাশুড়ির মুখে টমেটো নাম শুনলে এটা নিয়ে সারাজীবন ক্ষ্যাপানোর অস্ত্র হবে।
হাসনাত ভাল ক্রিকেট খেলে । এলাকায় মোটামোটি এশ নামে পরিচিত, যদিও ব্যাপারটা তার কাছে খটকা লাগে। ছেলেরা ঐশ্বরিয়ার এশ ডাকে নাকি ক্রিকেটার আশরাফুলের এশ ডাকে এই ব্যাপারে সে সন্দিহান । তার মত তার জীবনটাও সাদাসিদে, ঝামেলা বিহীন । এই ঝামেলা বিহীন জীবনে নতুন একটা ঝামেলা নিয়ে আছে সে। ঝামেলার নাম,
পুতুল
পুতুল নুজাতের বান্ধবী । স্কুলে একসাথে পড়ে। মোটামোটি পাঁচ বছরের সম্পর্ক হলেও এরা খুব ক্লোজ । প্রায় সময় তাদের বাসায় আসা হয় পুতুলের। হাসনাত পুতুলকে পছন্দ করে চারমাস হল । নুজাতের জন্যে বই আনতে একদিন তার বাসায় গিয়েছিল সে। নুজাতের মোটামোটি সব হুকুম পালন করতে হয় হাসনাত হাসনাতকে। সুবিধে হল হাসনাতকে আর চিল্লাচিল্লির মধ্যে পড়তে হয়না। বার্গার খেতে ইচ্ছে হলে বার্গার আনতে হবে, তার জামা আয়রন করে দিতে হবে, দরকার হলে বাইরে ঘুরাতে নিয়ে যেতে হবে টাইপ সাধারন কাজ ।
হাসনাত সেদিন তপ্ত রোদে ছায়ার পিছে পিছে হেটে গিয়েছিল পুতুলদের বাসায়। জাহানারা বেগম দরজা খুলে দেয়, পুতুল বই এনে দেয়। ব্যাস, সে বাসায় চলে আসে। সমস্যা হল সেদিন পুতুলের বাসা থেকে বের হয়ে তার মাথা এলোমেলো হয়েছিল । বাসায় এসেও ঠিক হয়নি, তার ধারনা এই সমস্যা কখনো ঠিক হবেনা। পুতুল সেদিন গোসল করে বের হয়েছিল, ভেজা চুল নিয়ে হাসনাতের সামনে এসেছিল । হাসনাতের ধারনা সেদিন পুতুল আসেনি; পুতুলের উপর ভর করা কোন পরী এসেছিল ।
সমস্যা হল মেয়েদের উপর পরী ভর করার কথা না, পরী ভর করে ছেলেদের উপর। সুদর্শন আর শক্তিশালী পুরুষদের পরীরা পছন্দ করে তাঁদের দেশে নিয়ে যায়। মেয়েদের উপর ভর করবে জ্বীন । ইয়া বড় শরীর, গরম গরম নিঃশ্বাস নিবে এরকম জ্বীন । কিন্তু, হাসনাত নিশ্চিত সেদিন পুতুলের উপর পরী ভর করেছিল,
আর এই জন্যেই হাসনাত সেদিন পুতুলের প্রেমে পড়েছিল
পুতুল খুব ধার্মিক মেয়ে । হাসনাতকে ভাইয়া ডাকে, আর খুব গুছিয়ে রাখে নিজেকে। বাইরের মানুষের সামনে তেমন আসেনা, প্রয়োজন ছাড়া কখনো হাসনাতের সাথেও কথা বলেনি। মাথা নিচু করে হাটে । নুজাতের মুখে ওর এত প্রশংসা শুনেছে যে, হাসনাত নিশ্চিত এই মেয়ে কখনো প্রেম করবে না এবং হাসনাতের জীবনে এই পরীটা সবসময় অপূর্ণ হয়ে থাকবে,
অসমাপ্ত প্রেম
পুতুল কবিতা লিখছে। রাতের খাওয়া শেষ। এখন এগারোটা পঞ্চাশ । তার ঘুমের সময় হয় দশটায়, নিয়ম মেনে চলাই পুতুলের অভ্যাস। কিন্তু, বছরের একটা দিন সে নিয়ম মানে না। সে জানে দশটায় ঘুমালেও ঠিক রাত বারোটায় তার বাবা-মা উঠিয়ে দিবে, তাদের কাছে এই দিনটা সারা বছরের আগ্রহ। আর দশ মিনিট পর পুতুলের জন্মদিন, সে ঠিক পাঁচ মিনিট পর লাইট নিভিয়ে ঘুমানোর ভান করবে। বাবা-মা সারপ্রাইজ দিয়ে খুব আনন্দ পান, তাদের চোখে মুখে আনন্দ থাকে। এই আনন্দ থেকে তাদের বঞ্চিত করা ঠিক না।
আজ দুজন সারা বিকেল শপিং এ ছিল। পুতুল অলরেডি চেক করে রেখেছে মা কি এনেছে। সারা বিকেল ঘুরে এনেছে ডিএসএলআর ক্যামেরা । ক্যামেরা দেখে তার হাত কাপা শুরু হয়েছিল, হাত কাপা অবস্থায় সে রুমে এসেছে। তার অনেক আনন্দ হচ্ছে। মা তার সব পছন্দ বুঝেন, পুতুলের একটা ভাল ক্যামেরার খুব সখ ছিল । আশ্চার্য, তার কোন সখ অপূর্ণ থাকে না ।
রাত বারোটা। পুতুল কাথা মুড়িয়ে শুয়ে আছে। দরজা খুলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। পড়ার টেবিলের উপর কিছু রাখার শব্দ, নিশ্চই কেক। লাইটের সুইচ দেয়া হয়েছে। পুতুলের দম বন্ধ হয়ে আসছে। এটা সারপ্রাইজ না, কারন সে সব জানে। তবুও তার এই ভালোবাসা অসহ্য লাগে।
-পুতুল, উঠ। সকাল হয়ে গেছে।
মায়ের এই ডাকটা কমন। প্রত্যেক বছর একিই কথা বলে জাগাবে। নতুন কিছু বোধহয় খুজে পায়না । পুতুল চুপ করে আছে। আর কিছুক্ষন ডাকুক।
-পুতুল। নামাজ পড়বি না? কিরে, উঠ । জাহানারা বেগম কাধে হাত দিয়ে দুলাচ্ছেন ।
পুতুল উঠে গেল এবং খুব দক্ষ অভিনেত্রির মত অবাক হয়ে টেবিলে রাখা কেকটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভাব দেখলে মনে হবে সে জীবনে কেক দেখেনি, আজ দয়া করে তাকে কেক দেখানো হচ্ছে এবং সে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। সেলিম সাহেব অনাড়ি হাতে বাজি ফুটানোর চেষ্টা করছেন। এই ব্যাপারটাও পুরানো। প্রত্যেকবার একিই কাজ করলেও এখনো তিনি বাজি ফুটাতে ভয় পান। দুমদাম করে তিনটা বাজি ফুটানো হল এবং পুতুল আরো বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল । পুতুলের এই মূহুর্তটা জলের গানের ‘এমন যদি হত, আমি পাখির মতন’ মনে হয়।
জন্মদিনের কেক কাটার ঝামেলা দশ মিনিটের, তবু রাত দুইটা পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়। ছোট্র পরিবারের গল্পের আসর। জাহানারা বেগম একটু সংশয়ে আছেন। তিনি হাতের ক্যামেরাটা মেয়ের হাতে তুলে দিলেও তার স্বামী এখনো কিছু দেননি। ঘটনা কি!
ব্যাপারটা পুতুলের কাছেও অবাক লাগছে। সে ক্যামেরা হাতে পেয়ে অনেক্ষন আনন্দ করল। বাবা মায়ের ছবি তুলল অনেক। কাল তার সব গাছ আর ফুলের ছবি তুলা হবে। ছবির ভান্ডার করতে হবে তাকে, এই সখটা তার অনেক পুরানো । মা সবসময় তার সখগুলো বুঝেন। কিন্তু বাবা কোন কিছু দিচ্ছেন না এইটা তাকে খটকা দিচ্ছে । রাতে ঘুমানোর আগে জাহানারা বেগম জিজ্ঞেস করে ফেললেন;
-পুতুলের জন্যে কিছু আনলেনা এবার?
সেলিম সাহেব হাসছেন। অন্ধকারে নিশ্চুপ হাসি জাহানারা বেগম ধরতে পারেনি। কিছুক্ষন পর নাক ডাকার শব্দ শুনা গেল। জাহানারা বেগমের অস্বস্তি আরো বাড়ছে, তার স্বামী এই ভুল করতেই পারেনা। নিশ্চই কোন বড় কিছু করে রেখেছে।
বড় কিছুনা, মোটামোটি টাইপ একটা সুনামি যাচ্ছে সকাল থেকে । পুতুল একচেটিয়া চিৎকার করছে সকাল থেকে। জাহানারা বেগম ভয় পেয়ে মেয়ের রুমে দৌড়ালেন এবং নিজেও থমকে গেলেন। ঘটনার সারসংক্ষেপ হল, পুতুল সকালে উঠে নামাজ পড়ে গাছে পানি দিয়েছে, ক্যামেরা নিয়ে গাছের ছবি তুলেছে এবং স্কুলে যাবার জন্য গোসল করতে বাথরুমে গিয়েছিল। বের হয়েই তার দম বন্ধ হয়ে আসে বিছানার উপর বেহালা দেখে।
ব্যাস, বেহালার স্টিক নিয়ে অনেক্ষন চেঁচামেচি করল, এখন মনের আনন্দ নিয়ে বেহালা বাজানোর চেষ্টা করছে। উহু, কাচা হাত। এখনো বেহালা বাজানো শিখেনি। বেহালার ওস্তাদ রাখতে হবে এবার। জাহানারা বেগম মেয়ের আনন্দ দেখে একটু মন খারাপ হয়েছে, সেলিম সাহেব এবার তাকে হারিয়ে দিয়েছেন। এটা জাহানারা বেগমকে জ্বালাচ্ছে, ব্যাপারটা অনুচিত। তার স্বামী অন্যায় করেছেন। যে জিনিস তিনি নিষিদ্ধ করেছেন ঘরে আবার সেই জিনিস নিয়ে মেয়েকে খুশি করানো এটা ঠিক করেনি। আজ মেয়ে স্কুলে যাক, বড় ধরনের ঝগড়া হবে।
সেলিম সাহেব আয়নার দাঁড়িয়ে শার্ট ইং করছেন। খুব আনন্দে আছেন তিনি। এই মূহুর্তে যুবক বয়সের একটা গান মনে পড়ছে খুব । ‘দিলবার দিলবার’। গানটা তার মুখস্থ নেই, থাকলে গাওয়া যেত। সেলিম সাহেব গুনগুনাচ্ছেন তবুও। এখন তিনি অফিসে বের হবেন, মেয়ের সাথেই বের হতে হবে। যদিও প্রতিদিন নয়টায় বের হন, আজ বের হবেন আটটায়, মেয়ের সাথে সাথে প্রস্থান হতে হবে । জাহানারা বেগম থেকে নিস্তার প্রয়োজন আজ ।
হাসনাত হাঁটছে, সোজা রাস্তায় হাটা না। উঠানে পায়চারী। রফিক সাহেব ইদানীং একটু বেশি চিন্তিত ছেলেকে নিয়ে। আর যাই হোক এই ছেলে দিয়ে শক্ত ভবিষ্যত হবার সম্ভাবনা নেই। তার স্ত্রীর ধারনা এই ছেলের ভবিষ্যৎ অনেক সুন্দর হবে। যাদের মনে ঝামেলা নেই, এদের জীবনেও ঝামেলা নেই। ছেলেটার একটা লক্ষ্মী বউ আসবে, ছিমছাম জীবন কাটাবে দুইজন। রফিক সাহেব এইসব বিশ্বাস করেন না। তার ধারনা মহিলা মানুষ ঘরে বসে সবকিছু টিভিতে দেখানো নাটক মনে করে, বাস্তবতা তারা ঠিকভাবে বুঝতে পারেনা।
হাসনাতের হাতে ‘উচ্চতর বীজগনীতে’র বই নিয়ে অপেক্ষা করছে নুজাতের জন্য, কিছুক্ষন পর ওর স্কুল ছুটি হবে। নুজাতের অংক প্রাইভেট থাকে স্কুল ছুটির পর। মেয়েটা ভুলে গেছে তা নয়। হাসনাত ইচ্ছে করে ব্যাগ থেকে বীজগণিত সরিয়ে রেখেছে। সরানোর কারন, নুজাত স্কুল শেষে ফোন দিবে বইটা আনার জন্য, হাসনাত নিয়ে যাবে। তখনি পুতুলকে দেখা যাবে। বুদ্ধিটা দিয়েছে তাঁর বন্ধু আসহাব ।
গত এক সপ্তাহ পুতুল বাসায় আসেনা, হাসনাতের কাছে এখন এটা অসহ্য লাগে। নেশা নেশা ভাব আছে পুতুলের মধ্যে। তাকে দেখলে সেই নেশা শেষ হয়। নাহলে শুধু মন না, শরীরের রক্তও রগে রগে অশান্তি করে। ব্যাপারটা নিয়ে আসহাব একটা সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছে, রক্তে এখন পুতুলের অনুভূতিটা মিশে গেছে। এটাই নেশা তৈরী করে তার শরীরে।
নুজাত কল দিয়েছে, হাসনাত ফোন ধরেই ঘর থেকে বের হল। তার পাগুলো অবশ হচ্ছে, বেশি সমস্যা। পুতুলের চারপাশে গেলেই পা অবশ হয়ে যাবে এটা নিয়েও আসহাবের সুন্দর ব্যাখ্যা আছে। হাসনাতের সেক্স সমস্যা; সিম্পল । হাসনাত ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে, এমন কিছু হলে লজ্জার ব্যাপার। আসহাব অবশ্য একজন ডাক্তারের কার্ড দিয়েছে, যৌন বিশেষজ্ঞ। ডা কামরুল ইসলাম, এমবিবিএস (সিওএম), এম ফিল (ফ্লোরিডা) । সিলেট ওসমানী মেডিকেল থেকে পাশ করা। এরপর আবার ফ্লোরিডায় গিয়েছে বড় ডিগ্রি নিতে। রোগীর ভীর লেগে থাকে। নামী ডাক্তার। এরমধ্যে আসহাব সিরিয়াল দিয়েছিল গত সপ্তাহে। এক সপ্তাহে পর সিরিয়াল পেয়ে গতকাল রাতে দেখাতে গিয়েছিল ডাক্তার।
হাসনাতের জীবনে করুন একটা অধ্যায় এই ডাক্তার দেখানো। আসহাবের সাথে গিয়েছিল সন্ধ্যার পর সেই ডাক্তারের কাছে। গিয়েই দেখল রোগীরা অপেক্ষা করছে, এরমধ্যে আবার তার বাবার বন্ধু কফিল আছেন । ব্যাটা অলরেডি দুইটা বিয়ে করেছে, এর যৌন সমস্যা থাকা স্বাভাবিক। কফিল সাহেবকে দেখে হাসনাত বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, সিরিয়ালে ডাক আসলে আসহাব তাকে ফোন দেয় সে ভিতরে আসে। ভিতরে ডুকতেই কপিল সাহেবের সাথে দেখা। হাসনাতের পা আবার অবশ হয়ে গেল! আজব ত! পা ত পুতুলকে দেখলে অবশ হবার কথা, কপিল সাহেবের মত বৃদ্ধ মানুষকে দেখে না।
হাসনাত কফিল সাহেবের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে দ্রুত চেম্বারে ডুকল। ইজ্জত শেষ, এই বয়সে এই ডাক্তারের কাছে কেন এই কথাটা তাঁর বাবা জানলেও সমস্যা। হাজারটা প্রশ্ন করবেন।
-কি সমস্যা?
-পা অবশ হয়ে যায় বউয়ের সামনে গেলে। আসহাবের জবাব।
-রোগী আপনি? আসহাবকে জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তার।
-না
-তাহলে? অযথা কথা বলবেন না। রোগী নিজে বলবে তাঁর কি সমস্যা। আপনি বিবাহিত? আশরাফের দিকে তাকিয়ে।
-না। ডাক্তার এবার চটে গেলেন । বিবাহিত না হলে বউয়ের সামনে কিভাবে যাবে! গরম চোখে আসহাবের দিকে তাকালেন। আসহাব দাত বের করে হাসছে, বেহায়া টাইপ হাসি ।
-স্যার, আমি একটা মেয়েকে পছন্দ করি।
-তো?
-তার সামনে গেলে পা অবশ হয়ে যায়, শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ থাকে।
-আমার কাছে কেন আসছেন?
-যৌন দূর্বলতা ।
- কাউকে দেখলে পা অবশ হওয়া ত যৌন দূর্বলতা না, মানসিক দূর্বলতা। কে বুদ্ধি দেয় এসব ফালতু কথায়?
হাসনাত আসহাবের দিকে তাকাল, আসহাব এখনো হাসছে। বেহায়া টাইপ হাসি।
ঘটনাটা হাসনাতকে লজ্জা দিয়েছিল। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আসহাবের সাথে কথা বন্ধ রাখবে। কিন্তু আসহাব ছেলেটা অতি ভালো ছেলে। পৃথীবিতে ভাল ছেলেদের লিস্ট করা হলে আসহাব সেই লিস্টে থাকবে না , সে থাকবে অতি ভালদের লিস্টে । তার বাবা-মা গ্রামে থাকে। সে ভূতের গলিতে একটা মেস রুমে থাকে । সারাক্ষন নিজের মত করে ঘুরবে, ক্লাস করবে আর সবার সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করবে। ব্যাপারটা অনেকের কাছে বিরক্তিকর, কারন আসহাব আজ অবধি কারো সমস্যার সমাধান করতে পারেনি,
বাড়াতে পেরেছে ।
পুতুলকে দেখা যাচ্ছে। পাড়ার মোরে দাঁড়িয়ে আছে। হাত নেড়ে নুজাতের সাথে গল্প করছে। মানুষ এত সুন্দর করে হাত নাড়াতের পারে জানা ছিল না। হাসনাত অবশ পা নিয়ে নুজাতকে বই দিল। পুতুল সালাম দিল হাসনাতকে। হাসনাত তার দিকে তাকিয়ে হাসল, পুতুলের চোখ ভিজে হয়ে আছে। মারাত্তক সুন্দর লাগছে এই ভেজা চোখে । হাসনাতের ইচ্ছে করছে হাত দিয়ে সে চোখ স্পর্শ করতে। আচ্ছা,
মানুষের সব ইচ্ছে পূরন হয়না কেন?
হয়, সব ইচ্ছে পূরণ হয়না তা ঠিক না। হাসনাত পুতুলকে দেখতে ইচ্ছে করেছিল, দেখেছে। ভেজা চোখ নিয়ে পুতুল হাটা দিল। নুজাতের সাথে গল্প করতে করতে যাচ্ছে। পুতুল কি জানে তার চুল অসাধারনের পর্যায়ে পড়ে? ব্যাপারটা না জানাই ভাল। হাতি তার বড় দুইটা কানের জন্যে তার শরীর দেখতে পারেনা। তাই সে জানেনা সে কতটা শক্তিশালী। জানলে সে পৃথীবি রাজত্ব করার চেষ্টা করত, প্রকৃতির নিয়ম উলটে যেত।
প্রকৃতি সুন্দর থাকত না ।
হাসনাত আজকাল স্কুলের শিক্ষক হতে ইচ্ছে করছে। আর কিছু না হোক অন্তত, পুতুলকে পড়ানো যেত। এক ঘন্টা সময় তার সামনে থাকা যেত। নাহ, এইম ইন লাইফ চেঞ্জ করতে হবে, স্কুলের অংক টিচার হতে হবে তাকে। সমস্যা হল হাসনাত অংকে কাচা, বীজগনীতে সে কিভাবে পাশ করেছে আজও বুঝতে পারেনি। হয় তার অংক খাতা যিনি কেটেছেন, তিনি হাসনাতের প্রতি দয়া করেছেন, নাহয় তিনি খাতা না দেখে পাশ মার্ক দিয়ে দিয়েছেন;
দায়িত্বের চরম অবহেলা ।
নুজাত অংক বই খুলে বসে আছে। এই অংক শিক্ষক এলাকায় নাম করা। পানির মতন বুঝেন অংক। নুজাত ঘোষনা দিয়েছে সে কখনো শিক্ষ্যামন্ত্রী হলে অংক বইয়ের নাম পালটে দিবে। সাধারণ গনিতের জায়গায় অসাধারন গনিত বসাতে হবে। গণিত বিষয়টি কখনই সাধারণ হতে পারেনা। ভাইয়ের মতন সেও অংকে দূর্বল। সে ঘোষনা দিয়েছে এটা বংশীয় সমস্যা। নুজাতের খুব ইচ্ছে সে বড় হয়ে শিক্ষ্যামন্ত্রী হবে। শিক্ষ্যামন্ত্রী হবার পরিকল্পনা সে বাবাকে বলেছিল। রফিক সাহেব এক ধমক দিয়ে বলেছিলেন, বেশী বকবক করবি বিয়ে দিয়ে দিব। বিয়ে দিলে উলটা পালটা চিন্তা বন্ধ হবে তোর। নুজাত অবাক হয়ে গেল, শিক্ষ্যামন্ত্রীর সাথে বিয়ের সম্পর্ক কি। বিয়ের সম্পর্ক হলে হবার কথা রেলমন্ত্রীর সাথে, ষাট বছর বয়সেই বিয়ে করে আলোচিত হওয়া মানুষ।
নুজাতদের গনিত শিক্ষকের নাম সালাম । পুরা নাম নুজাতরা জানেনা, সবাই একনামে অংক স্যার হিসেবেই চিনে। স্কুলে আর এলাকায় বিখ্যাত এই নাম। অংক স্যারের কাজ হল শুকনা সুপাড়ি আর হাকিমপুড়ি জর্দা দিয়ে দুই মিনিট পরপর পান মুখে দেয়া। তার কথায়, তার জীবনে দুইটা জিনিষ খুব ইম্পর্ট্যান্ট। প্রথম, পান, দ্বিতীয়, শুকনা সুপাড়ি ;
আজগুবী জীবন।
এই আজগুবী জীবন চালানো মানুষটা সুখি বিবাহিত মানুষ। তার শান্ত একটা বউ আছে, অনেকের ধারনা এই শান্ত বউয়ের কারনে সালাম স্যার ঠান্ডা মাথায় অংক নিয়ে মাথা ঘামাতে পারেন। এখনো বাচ্চা কাচ্চা নেই। যতটুকু শুনা যায়, বাচ্চা হবার সম্ভাবনা নেই তাদের। মানুষটা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তার কথা হল স্কুলের সব মেয়ে তার বাচ্চা । ব্যাপারটা তার বউ সিরিয়াসলি নিয়েছেন, তাই স্কুলের মেয়েগুলোর জন্য নাস্তা বানিয়ে রাখেন, এমনকি মাসে একবার পোলাও দিবস পালিত হয়। বাচ্চাদের মতে সালাম স্যারের এত ছাত্রী প্রাইভেট পড়ার পিছনে মূল উদ্দেশ্য গনিত না, তার বউয়ের হাতের রান্না ।
অমৃত ।
সালাম স্যার অর্ধেক পান মুখে দিয়ে শুরু করলেন,
-আজ অংক করাব না।
নুজাত ব্যাগ থেকে বের করা রুল টানা খাতাটা আবার ঢুকিয়ে রাখল।
এই ব্যাটার আজ বিমরতী ধরেছে। বীমরতী ধরলে এই মানুষের পান খাওয়া বেড়ে যায়, আর অনবরত কথা বলে ।
-অংক করে কি লাভ বল। জীবনের সব সমীকরণ আমরা মিলাতে পারি? পারিনা। আমার চাকরী জীবনের প্রথম দিকের একটা গল্প বলি ।
তখন আমি নতুন চাকরিতে ঢুকেছি। এরমাঝে ছুটি নিয়ে বাড়িতে যাই। বাড়িতে গেলে রেল লাইনে হাতা আমার অভ্যাস। এমনি এক রাতে রেললাইনের উপর হাঁটছিলাম। কুকুর কান্না করছে। কু কু করে টাইপ কান্না । আমার কুকুর বিড়ালের কান্না ভাল লাগে না। আম্মা স্ট্রেট বলে দিয়েছেন কুকুর বিড়ালের কান্না অভিশাপের কান্না। বিপদের সংকেত। বিষয়টা হতে পারে কুসংস্কার, কিন্তু এই ধারনাটি মা আমার মনের ভিতর ঘেথে দিয়েছেন। সিমেন্টের সাথে যমুনা নদীর ঝরঝরে বালু মিশালে যে গাথুনী সৃষ্টি হয়, এরচেয়ে কঠিনভাবে ঘেথেছে মনে। এদের কান্না আমার মন খারাপ করে দেয়। মনে হয় বড় কোন বিপদ আসছে । সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল বিপদ সত্যিই আসে।
ভয়ানক কাকতালীয়তা
কুকুরের কান্নার শব্দ এড়ানোর জন্য সামনে হাটা দিলাম। রাত এগারোটায় রেল লাইনের পাশে হাটতে আমার ভাল লাগে, এই অভ্যাস আমার স্কুল কলেজ জীবনে বেশী ছিল। এখন চাকরী প্রয়োজনে ঢাকা থাকি, বছরে হাতে গোনা কয়েকবার আসতে হয়। তখন রেল লাইনের পাশে একা রাতে হাটা হয়। সমস্যা হল যতই সামনে আগাচ্ছি কুকুরের কান্না সাথে সাথে যাচ্ছে।
আজব ত !
আজব ব্যাপারটা সমাধান করতে আওয়াজ লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলাম। উঁহু, এবার সরে যাচ্ছে। যতই আওয়াজ লক্ষ্য করে আগাচ্ছি, সরে যাচ্ছে। রেল লাইনের পাশের ঝোপে নড়াছাড়া অনুভব করলাম। মোবাইলের আলো দিয়ে গরম নিঃশ্বাস নিচ্ছে কুকুরটা। চোখ বন্ধ, পুরা শরীর গরম পানি দিয়ে কেউ ঝলসে দিয়েছে। এতেই ক্ষান্ত হয়নি, ধারালো কিছু দিয়ে মাথায় কোপ দেয়া হয়েছে। পুরা শরীরে চামড়া গলে গলে পড়ছে, পেটের দিকে মাংস ঝুলে আছে। এখানেও কোপ দিয়েছে বোধহয়।
আমি কি করব বুঝতে পারছিনা, পা কেমন জানি অবশ হয়ে আছে। আমার এই অভ্যাসটা বাঝে, ভয় পেলে বা নার্ভাস হলেই পা অবশ হয়ে যায়, শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ থাকে । অবশ শরীর নিয়ে পাশেই মক্তবের কল থেকে পানি আনতে গেলাম, উঁহু; পানি নেয়ার জন্য কিছুই নেই। আমি আবার সেখানে যাব কিনা ভাবছি। একটা খারাপ লাগা কাজ করছে মনে। এরচেয়ে বেশী হচ্ছে ভয়। কুকুরটার কান্না থেমে গেছে, এরসাথে চারদিকে কেমন নীরবতা নেমে আসল । কুকুরের মৃত্যুর অপেক্ষা বোধহয় প্রকৃতিও করছিল। সাহস করে আবার হাটা দিলাম, কুকুরটা এখন আর গরম নিঃশ্বাস ফেলছে না।
তার হৃদপিণ্ড কাজ করছিল না
আমার হৃদপিন্ডের গতি বেড়ে গেছে। পায়ের অবশ ভাবটা চলে গেছে, এখন নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে খুব । সারাটা রাত প্রকৃতি এই মৃতদেহ মাটিতে রেখে কাঁদবে, সকালবেলা এই রাস্তায় আবার ভিড় জমবে। সারাটাদিন রাস্তার এই পাশটা দিয়ে মানুষ নাক চেপে হাঁটবে। একদিন, দুইদিন, তিনদিন ... মৃতদেহ মাটির সাথে মিশে যাবে । নাক চেপে হাটা মানুষগুলো জানবে না কুকুরটা বার্ধ্যক্যে কিংবা অসুস্থ হয়ে মারা যায়নি, নিকৃষ্টভাবে এই প্রানীটাকে;
খুন করা হয়েছিল
রেললাইনের উপর বসে আছি, উঠতে ইচ্ছে করছেনা । আমি খুব নিষ্ঠুর প্রকৃতির একজন মানুষ। কাছের কেউ মারা গেলে আমার চোখে পানি আসেনা, মগবাজারে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে হাটু ছিলে গেলেও আমার চোখে পানি আসেনা। সেই অন্ধকার রাতে আমার চোখে পানি ছিল, কেউ দেখেনি;
আমি নিজেও না
ফোনে রিং হচ্ছে, নিশ্চয় বাসা থেকে কল দিয়েছে। রাত বারোটার পর বাসার বাইরে থাকা নিষেদ। এই নিষেদাজ্ঞা অমান্য করলে বিপদ হবে, গেটের তালা আটকানো থাকবে, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে এরপর ঢুকতে দিবে। এরচেয়ে ভয়ানক হল, এই বয়সেও আব্বুর বারো চৌদ্ধ লাইন গালি শুনতে হবে। নাহ, আজ নিয়ম ভাঙতে হবে, সবসময় ঘড়ি ধরে চলতে হবে এমন কোন আইন নেই। অনেক দিন আব্বার বকা শুনা হয়না, আজ নাহয় আবার স্কুল জীবনের মতন গালি শুনব, ভাতিজিরা এটা দেখে আগামী এক বছর আমাকে রাগাবে। এরা ছড়া বানিয়ে রাগাতে ওস্তাদ। কাল সকালে হয়ত ছড়া বানাবে,
‘বুড়া ব্যাটা নিয়ম ভেঙেছে,
নিয়ম ভেঙে বকা খেয়েছে।‘
ফোন বাসা থেকে আসেনি। ফোন দিয়েছে নিলু। আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল। শুধু গার্লফ্রেন্ড না, বউ ডাকতাম একসময় । নিলু কল দেয়ার কথা না। সে খুব জেদি মেয়ে, আমার সাথে সম্পর্ক শেষ হয়েছে দুই মাস আগে। আমি অবাক হয়েছি। অবাক হওয়া মানে যথাযথ বিস্ময়। সেই যথাযথ বিস্ময় নিয়ে আমি কল ধরলাম ।
-‘আমার বিয়ের ডেট ঠিক হয়েছে । আশা করি কোন ঝামেলা করবে না। তোমার ত সবসময় শেষদিকে ঝামেলা বাধানোর অভ্যাস। দয়া করে আমার সংসার নিয়ে খেলা করবে না। কিছু বলার আছে তোমার?
-আছে।
-কি?
-আমি কাল ঢাকা যাব। তুমি আমার সাথে যাবে।
ফোনটা কেটে গেল। ওপাশ থেকে কাটা হয়েছে। নিশ্চই ফোন কেটে এখন হাতের অসমাপ্ত মেহেদিটা শেষ করছে । মেয়েটা মেহেদি লাগাতে খুব পছন্দ করে। হাতের মাঝখানে নকশা করে আমার নামের প্রথম অক্ষরটা লিখে দিত। আমি অবাক বিস্ময়ে সেই ছবি দেখতাম, আর ভাবতাম এত ভাগ্যবান কেন আমি। সেই ভাগ্যবানের ভাগ্যটা এখন অন্য কোন পুরুষের কাছে চলে যাবে এটা হতে পারেনা।
আমি ব্যার্থ প্রেমিক হতে চাইনা। যাক, জীবনে একটা সমীকরন মিলেছে। মৃত কুকুর আর জীবিত আমি । আজ সারারাত রেল লাইনে বসে থাকব, মৃত কুকুরের সাথে গল্প করব, তার মৃত্যু যন্ত্রনার গল্প শুনব, আমার গল্প শুনাবো । জীবন যুদ্ধে সব সমীকরনের হিসেব হয়না, কিছু গল্প মৃত কুকুরটার মতন হয়ে থাকে,
বেহিসাবি সমীকরণ।
যাও, গল্প শেষ আমার। ছুটি তোমাদের আজ ।
পুতুল কান্না করছে খুব । সে অল্পতেই কাঁদে । সিনেমায় নায়ক জসিম সাবানার জন্য লটারীর টিকেট জিতলেও কাধে, ইমোশনাল বিজ্ঞাপন দেখলেও কাঁদে, আবার বাবা-মা ঝগড়া করলেও কাঁদে । কিন্তু আজকের গল্পটা অন্যরকম। তার কুকুরটার জন্য খুব খারাপ লাগছে । কুকুরটাকে এভাবে কে মারবে, কেন মারবে? প্রান এত সহজ হতে পারে?
নুজাতের এসব ন্যাকামি লাগে। পুতুলের সব কিছু অন্যরকম । এই রকম মেয়ের গল্প ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনত। তার নানী দাদিরা এমন ছিলেন, সেটা ত সত্তর বছর আগের কথা, এরমধ্যে একবিংশ শতাব্দি আসছে, মেয়েরা কয়েকশ যাত্রী নিয়ে বিমান উড়ায় আকাশে, পুলিশের হেড হয়ে দেশ কন্ট্রোল করে, ত্রিশ বছর এই দেশ মেয়েরা শাসন করেছে । এই সময় কেন সে সত্তর বছর আগের মত চলাফেরা করবে। আজগুবি, এই ব্যাটা কুকুরের গল্পটা বানিয়ে বলেছে। আসল কথা সে সাহসী প্রেমিক ছিল এটা সবাইকে বুঝানোর জন্যে এত লম্বা গল্প জুড়ে দিয়েছে। একটা গল্প বলল আর পুতুল সে হু হু করে কাঁদবে;
কান্না এত সস্তা?
-উঠ। বাসায় যাব।
পুতুল লাল চোখ নিয়ে হাটা শুরু করল। তার মনে একটা বিষয় খুটখাট করছে, কুকুরটার কি দোষ ছিল । আরেকটা ব্যাপার, বেহালা বাজানোর গ্রামার শিখতে হবে । একটা বই লাগবে, নুজাতকে বলবে?
-নুজু, বেহালা শিখার জন্য গ্রামার বই কই পাব রে?
-জানিনা ।
-খোজ নিয়ে দেখনা।
-এসব বাইক্কা কাজে আমি নাই। বেহালা বাজানো ইম্পর্টেন্ট কিছু না, দেশ চালানো ইম্পর্ট্যান্ট। আমি চিন্তা করছি প্রধানমন্ত্রী হব।
-কেন? তুই না শিক্ষ্যামন্ত্রী হবি বলতি সবসময়।
-বলতাম । এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়া লাগবে। দেশে পান-সুপারী বন্ধ করব।
-কেন?
-ওই ব্যাটা খবিসের মতন পান চাবাতে থাকে । তুই জিদ না করলে আমি কখনোই এই খবিসের কাছে প্রাইভেট পড়তাম না।
-মানুষ ত ভাল, আন্টিও ভাল। সবচেয়ে বড় কথা ভাল অংক বুঝে।
-তুই বেকুব। তোরে আগে আমি সোজা ভাবতাম, এখন দেখি বেকুব।
-কেন ? আমি বেকুব হব কেন?
-বেকুব না হলে কথায় কথায় চোখে পানি আনিস কেন? চোখে এলার্জি আছে? এলার্জি থাকলে ডাক্তার দেখা। পুরুষরে দেখাইস না আমরা মেয়ে জাতি নরম, দেখাইলে সেই পুরুষ তোর উপর শাসন করবে।
-কোন পুরুষ?
-দূর। যা বাসায় যা। বাসায় গিয়ে বেহালা বাজা, তোর জন্যে এটাই ঠিক আছে।
-বেহালা শিখার জন্য বই লাগবে ত।
-আচ্ছা। দেখি ভাইয়াকে বলে। ভাইয়ার এক বন্ধু বেহালা বাজায়, তার কাছে থাকতে পারে।
-দেখ না , উপকার হবে, আব্বুকে শুনাব। এত সখের জিনিষ দিল, যদি বাজাতেই না পারি তাহলে আব্বু কষ্ট পাবে।
নুজাত বাসার দিকে হাটা দিল। এই মেয়ে বেকুব না, সোজাও না। এই মেয়ের মনটা একটু বেশিই অসাধারন। সমস্যা এখানেই। এই ভাল মনের মেয়েটির জন্য বেহালা বাজানোর গ্রামার বুক আনতে হবে। ভাইয়াকে বললেই হবে, তার ভাই ইদানীং প্রেমে পড়েছে। ব্যাপারটা নুজাত টের পেয়েছে কয়েকদিন হল। নুজাতের অভ্যাস হল তার ভাইয়ের টেবিল ঘাটাঘাটি করা, সেদিন তার ড্রয়ারে পুতুলকে লিখা ত্রিশটা চিঠি পেয়েছে। বুঝা যাচ্ছে প্রতিদিন একটা করে চিঠি লিখছে, কিন্তু চিঠির প্রাপককে দেয়ার সাহস তাঁর ভাইয়ের নেই। কোন চিঠির ভাষা সুন্দর নেই। আরেহ আজব, এই যুগে ‘তোমাকে ছাড়া বাচব না টাইপ চিঠি কেউ লিখে? এই সম্পর্ক হতে দেয়া যাবেনা, তার ভাই এক বেকুব, পুতুল এক বেকুব। বেকুবে বেকুবে সংসার করলে বাচ্চাগুলা বেকুব স্কয়ার হবে।
অসম্ভব ।
জাহানারা বেগম খিচুড়ি রাধছেন। গরুর মাংস আর খিচুড়ি, সাথে ইলিশ মাছ ভাঁজা । এই আইটেমগুলো হল তার মেয়ের পছন্দের। শুধু মেয়ের না, তার স্বামীও অসম্ভব পছন্দ করে। বিয়ের পর সে সকালে ঘুম থেকে উঠে খিচুড়ি খুজত। গরম চা এনে বিছানায় ঘুমানো স্বামীকে জাগানো মেয়েদের জন্য একটা স্বপ্ন । সেই স্বপ্নে যদি স্বামী ঘুম ভেঙে খিচুড়ি খুজে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যায়। এই অন্যরকম স্বামীকে নিয়ে জাহানারা বেগম আজ আঠারো বছর সংসার করছেন।
মেয়েটাও হয়েছে বাবার মতন, খিচুড়ি হতে হবে শুকনো। একদম পানি থাকতে পারবে না। চালের দানাগুলো হাতে নিলে যাতে হাত শুকনো থাকে। সেই শুকনো খিচুড়ি এরা নরম করবে গরুর গোস্তের ঝোল দিয়ে। গরুর গোস্ত রান্না করাটাও আবার আলাদা। মশলা দিয়ে ঘন ঝোল করতে হবে। মশলা হবে ঝাল। বাবা-মেয়ে দুইটাই ঝাল খেতে ওস্তাদ । আমেরিকার ফ্লোরিডায় নাকি ঝাল খাওয়ার প্রতিযোগিতা হয় প্রতি বছর। জয়ী প্রতিযোগীদের আর্থিক পুরুস্কার দেয়া হয়। জাহানারা বেগম প্রায় চেঁচান;
-বাপ মেয়ে দুইটা গিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেই হয়। ফার্স্ট সেকন্ড প্রাইজ জিতে আসতে পারত।
বাবা মেয়ে এসব চিল্লাচিল্লি নিয়ে মাথা ঘামায় না। ইলিশ মাছ অবশ্য তার স্বামীর পছন্দ না, তার নিজেরও তেমন পছন্দ না। এই মাছটা মেয়ে খুব আয়েশ করে খায়। জাহানারা বেগম এই বয়সেও ইলিশ মাছের কাটা ভয় পান, আর তার মেয়ে কাটা সহ মাছ চিবিয়ে খায়। জাহানারা বেগম গরুর আর খিচুড়ি রান্নায় এত পোক্ত হয়েছেন যে, বাপ মেয়ের কাছে অন্য কারো হাতের রান্না ভাল লাগেনা। এটাই জাহানারা বেগমের শান্তি। তিনি আরো মন দিয়ে রান্না করেন, নতুন কোন স্বাদ দিতে চেষ্টা করেন।
আজ মেয়ের জন্মদিন, জন্মদিনের শেষ অংশ হল রাতের খাওয়া। এর আগে সেলিম সাহেবের বিচার হবে। সকালে পালিয়ে গেছে, সারাদিন ফোন ধরেনি। ফোন না ধরার বিচারও হবে। তারপর খাওয়া। কলিংবেলের আওয়াজ আসছে। নিশ্চয় পুতুল এসেছে। পঁচটা বেজে গেছে, স্কুল আর প্রাইভেট শেষে মেয়েটা এই সময়ে আসে । কাজের মেয়ে খুলে দিয়েছে দরজা, এখন পুতুল হাত মুখ ধুবে, কাপড় চেঞ্জ করে ঠিক এক ঘন্টা ঘুমাবে। এরপর উঠে কিছুক্ষন টিভি দেখবে। তার পড়ার টেবিলে বসা হয় রাত আটটায় । জাহানারা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েটা বড় হয়ে গেছে, একদিন কেউ এসে হুড়োহুড়ি করে নিয়ে যাবে। তার সংসার খালি হয়ে থাকবে। আরেকটা বাচ্চা নেয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলেন তারা, খোদা দেননি। খোদা হয়ত দুনিয়ার সবচেয়ে লক্ষী মেয়েটাকে দিয়ে পরিপূর্ণ করে রেখেছেন তাদের জীবন,
তাদের সংসার ।
নুজাত রেগে আছে। রেগে থাকার কারন যৌক্তিক। তার ভাই তার ফোন ঘাটতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। সে প্রাইভেট থেকে এসে বাথরুমে গিয়েছিল গোসল করতে। এসে দেখে তার ভাই ফোন থেকে ল্যপটপে কিছু নিচ্ছে। ভয়ানক ব্যাপার। তার বাসার কেউ তার রুমে ঢুকার সাহস পায়না, এমনকি মাও না। তার বাথরুমও সে নিজেই পরিস্কার করে, কাজের লোক ঢুকা নিষেধ। নুজাত চেক করেছে, না তেমন কিছুই না। শুধু তার ফোনে পুতুলের যত ছবি আছে সব নিচ্ছিল, প্রায় নেয়া হয়ে গেছিল। এই সময় সে আসে।
হাসনাত মুখ শুকনা করে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে নুজাত রাগান্বিত হয়ে বসে আছে। হাসনাতের খুব ভয় হচ্ছে, তার মনে হচ্ছে আজকে বড় কিছু একটা হবে। নুজাত এখন তার ল্যাপটপ ঘাটছে, তার চেহারাটা দেখা যাচ্ছেনা। হাসনাতের চশমা ঝাপসা হয়ে আছে, চশমা পরিস্কার করতে হলে হাত নাড়াতে হবে। হাসনাতের হাত নড়ানোর সাহস হচ্ছেনা।
-কি করছিলি?
-কিছু না।
-আমার ফোন থেকে কি নিয়েছিস।
-কিছু না।
-আমি ত দেখছি
হাসনাত চুপ করে থাকল। এখন উত্তর দিতে গেলে ঝামেলা বাঁধবে ।
-পুতুলের সাথে তোর কি সম্পর্ক?
-কোন সম্পর্ক নেই
-তার ছবি কেন নিচ্ছিলি?
হাসনাত চুপ।
-উত্তর দে নাহলে আব্বুকে বলছি
হাসনাত চুপ।
-বলবি ? নাকি যাব বাবার কাছে?
হাসনাত চুপ। নুজাত রেগে রুম থেকে বের হয়ে গেল, পাঁচ সেকেন্ড পর আবার রুমে ঢুকল।
-পুতুল এক বেকুব, তুই এক বেকুব। কোন দিক দিয়ে তোদের মিলে?
হাসনাত চুপ
-তোর লজ্জা করেনা ছোট বোনের বান্ধবীর দিকে নজর দিতে? আমি মুখ দেখাতে পারব? তোর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই আজ থেকে। যা ভাগ এখান থেকে। বেকুব।
হাসনাত চলে গেল। তার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। সে খুব খারাপ কাজ করেছে বলে তাঁর মনে হচ্ছেনা। নুজাতের বাড়াবাড়ি এসব। আজ শুধু কয়েকটা ছবি নিয়েছিল এটার জন্য এত কথা শুনতে হল। রুমের দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকবে এখন। মাথা ধরেছে । দরজার সাথে বাড়ি খেল, চশমাটা এখনো পরিস্কার করা হয়নি।
নুজাতের গা কাপছে রাগে। হাসনাতের ল্যপটপ নিয়ে দেখল আর কোন ছবি আছে কিনা। ল্যাপটপের স্ক্রিন ব্যাকগ্রাউন্ডে ভাই-বোনের ছবি। ছবিটা গতবার গ্রামের বাড়িতে তুলা হয়েছিল। নুজাতের হঠাত মন খারাপ হয়ে গেল। এভাবে বকা ঠিক হয়নি। তার ভাইয়ের কোন খারাপ অভ্যাস নেই, আজ অবদি কোন খারাপ কাজ করেনি। একটু বোকা টাইপের এটাই। বোকা হলে যে কাউকে পছন্দ করতে পারবে না এমন কোন আইন ত নেই। তাছাড়া তার পছন্দ ভাল, পুতুলের মত মেয়ে যে কোন পরিবারের জন্য ভাগ্যের । নুজাত ল্যপটপ নিয়ে ভাইয়ের রুমের দিকে চলল। রুমের দরজা খুলল নিঃশব্দে। হাসনাত লাইট বন্ধ করে উপুর হয়ে শুয়ে আছে। নিশ্চিত কাঁদছে । এই ছেলে একটু কষ্ট পেলেই একা একা কান্না করা ছোট থেকেই অভ্যাস। রুমের অবস্থা এলোমেলো। নুজাত ল্যাপটপ টেবিলে রেখে রুম গুছানো শুরু করল। গুছাতে গুছাতে কয়েকবার ডাকল ভাইকে। উঁহু, রাগ করেছে বেশী বুঝা যাচ্ছে। সব গুছিয়ে টেবিল ধরল। ড্রয়ার থেকে চিঠি নিয়ে জোরে জোরে পড়া শুরু করল ।
প্রিয় পুতুল,
পত্রের প্রথমে আমার ভালোবাসা নিও। আমি হাসনাত, পুরো নাম হেমায়েত হাসনাত । তোমার বান্ধবী নুজাতের বড় ভাই...’
আশরাফ উঠে দ্রুত চিঠিটা কেড়ে নিল।
-তুই আমার ড্রয়ার কেন ঘেটেছিস। আমি আব্বুকে বলে দিব আজ।
-যা বল। বল গিয়ে তোর ড্রয়ার ঘেটে চিঠি পড়েছি আমি।
-এসব ঠিক না। মানুষের ব্যাক্তিগত জীবন থাকে।
-আচ্ছা শুন। এই যুগে কেউ এভাবে চিঠি লিখে? প্রিয়, ভালোবাসা নিও। আমার পুরো নাম , আমার বোনের নাম, আমার বোন তোমার বান্ধবী । এগুলা চিঠিতে কেউ লিখে?
হাসনাত লজ্জা পাচ্ছে, ছোট বোন তার চিঠি পড়ে ফেলেছে ব্যাপারটা অনেক লজ্জার।
-শুন। তোর ল্যাপটপে পুতুলের সব ছবি দিয়ে দিয়েছি। মুখ বাকা করে রাখতে হবেনা। কাল পুতুলের চুলের ছবি তুলে আনব। খুশি ত? তোর ত আবার তার চুল পছন্দ।
-লাগবে না।
-লাগবে লাগবে। আমি তোর প্রেমের দালালি করতে পারব না।
-দালালি কি?
-তোর প্রেম ঠিক করে দিতে পারব না। নিজে নিজে পারলে করবি নাহলে থাক। এখন শুন, পুতুল বেহালা পেয়েছে । কিন্তু বাজাতে পারেনা। ওর জন্যে বেহালার একটা গ্রামার বই নিয়ে আয়।
-কই পাব?
-কই পাবি আমি কি জানি? নিয়ে আনতে পারলে পুতুল খুশি হবে। বুঝে দেখ। একথা বলে নুজাত বের হয়ে গেল।
হাসনাত সাধারনত রাতে বের হয়না। আজ বের হল সন্ধ্যার পর। উদ্দেশ্য আসহাবের মেস। আসহাব মোবাইল ব্যাবহার করেনা। তার কাছে এটা অযৌক্তিক আবিষ্কার মনে হয়। তার উদ্দেশ্য পড়ালেখা শেষ করে গ্রামে গিয়ে মুরগী পালবে, আর পুকুরে মাছ চাষ করবে। ছেলেটা আজব। এই আজব ছেলেটার কাছে সাহায্যের জন্য গেলে সে খুশি হয়। জানপ্রাণ উজার করে সাহায্য করতে নামে, কিন্তু পারেনা। কখনো কখনো উলটো ক্ষতি করে বসে।
-দোস্ত একটা উপকার কর ।
-বল, এখুনি করছি।
-আমার একটা গ্রামার বই লাগবে।
-আছে ত আমার কাছে, ইংরেজী না বাংলা। কোনটা?
-আরেহ ভাই মিউজিক গ্রামার। বেহালা।
-কেন?
-পুতুলের জন্য লাগবে। নুজাতের কাছে চাইছে।
-চল।
-কোথায়?
-নীল ক্ষেত।
-নীল ক্ষেত কেন?
-দুনিয়ার তাবৎ বইয়ের আবাসন হল নীল ক্ষেতে। যেই বই তুই আমেরিকা , ব্রিটেনের বড় বড় লাইব্রেরীতে পাবিনা সেই বই নীল ক্ষেতে পাবি।
-চল ভাই ।
হাসনাতরা একটা রিক্সা নিয়ে নীল ক্ষেতে পৌছালো সন্ধ্যা সাতটায়, পুরো নীল ক্ষেত তন্ন তন্ন করে খুজে রাত দশটায় খুজে পেল পুরানো বেহালা শিখার একটা গ্রামার বই। হাসনাত সেই রাতে আসহাবকে তার ভাই হিসেবে ঘোষনা করল।
সেলিম সাহেব বাসায় ফিরেছেন সাতটায়। মা আর মেয়ের জন্য কিছু চুলের ক্লিপ এনেছেন। বউ আর মেয়ে প্রায় চুলের ক্লিপ নিয়ে ঝগড়া করে। আজব দুনিয়া মেয়েদের। ঝগড়া করার জন্য কত বড় বড় বিষয় আছে দুনিয়ায়। ট্রাম্প, জিম সং ঝগড়া করে ক্ষমতা নিয়ে, খালেদা-হাসিনা ঝগড়া করে ক্ষমতা নিয়ে, আর তার ঘরে ঝগড়া হয় ক্লিপ নিয়ে।
-বিবি, বিবি।
জাহানারা বেগম এখনো রান্নাঘরে। সন্ধ্যার পর থেকে তার মন খারাপ হয়ে আছে। মন খারাপ হবার কারন বুঝা যাচ্ছেনা। সেলিম সাহেব এসে চা খেয়েছেন। এখন তাকে ডাকছে, এত সুন্দর ডাকার অর্থ আছে । কাল রাতের অপরাধ ঢাকা দিতে চুলের ক্লিপ এনেছে বিশটা। এখন বিবি বলে ডাকছে, এই ডাকটা জাহানারা বেগম রেগে থাকলে বলে।
-বল
-পুতুল ঘুম থেকে উঠেনি।
-দেখিনি। উঠার ত কথা, গিয়ে দেখ। হয়ত পড়ছে।
সেলিম সাহেব আনমনা হয়ে উঠলেন। মেয়ের সাথে একটু কথা বলে আসতে হবে। সারাদিন আজ ঝামেলা গিয়েছে। পুতুলকে দেখলে সেলিম সাহেবের ক্লান্তি থাকেনা। মেয়ের মুখ গ্লুকোজের মতন কাজ করে সেলিম সাহেবের জন্যে।
-পুতুল, ঘুমাচ্ছিস?
দরজা বন্ধ। সেলিম সাহেব দরজায় দুইটা টোকা দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। এই মেয়েটা লাইট বন্ধ করে ঘুমানো কবে থেকে শুরু করল। পুতুল ত অন্ধকার ভয় পায়। তার জন্যে ঘরে আইপিএস আনা হয়েছে এবং তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যেই ছেলের ঘরে আইপিএস নেই, সে ঘরে তার বিয়ে দিবেন না।
-মা উঠে যা। আটটা বাজে। লাইট দি?
সেলিম সাহেব লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। আশ্চার্য্য! বিছানায় পুতুল নেই। পুতুল ফ্লোরে বসে আছে, দেয়ালে হেলান দেয়া। এখনো স্কুল ড্রেস পড়া। সেলিম সাহেব পুতুলের মাথায় হাত দিয়ে মাথা তুলে ধরলেন । মেয়ের মুখ শুকিয়ে আছে, চোখ বন্ধ । সেলিম সাহেব ভ্যাবাচেকা খেলেন।
-জাহানারা, জাহানারা এদিকে আস।
জাহানারা বেগম মাত্র খিচুড়ির পাতিল চুলোয় উঠিয়েছেন, এই মূহুর্তে এখান থেকে সরে যাওয়া ঠিক হবে না। খিচুড়ি এখন ভাঁজা হবে, ভাজতে ভাজতে চুলোর কাছ থেকে একদম সরে যাওয়া ঠিক না। এক সেকেন্ডেও খিচুড়ি পাতিলের সাথে আটকে যায় , কিছুক্ষন পর পোড়া একটা ভাব থেকে যায়। তখন খিচুড়ি খেয়ে শান্তি পাওয়া যায়না, সোজা ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিতে হয়। জাহানারা বেগম অপচয় পছন্দ করেন না, অপচারী শয়তানের ভাই হলে,
জাহানারা বেগম হবেন শয়তানের বোন ।
-কই তুমি, এদিকে আসছ না কেন
জাহানারা বেগম এবার হচকিয়ে গেলেন, এভাবে ডাকছে কেন। তিনি চুলো কমিয়ে হাটা দিলেন পুতুলের রুমের দিকে। গিয়ে দেখলেন মেয়েটা ফ্লোরে হাটুগেড়ে বসে আছে। সেলিম সাহেব তাঁর মাশে মাথায় হাত ধরে রাখছেন। আজব ত! এখনো স্কুলের ড্রেস খুলেনি কেন। চেহারা কেমন জানি ফ্যাকাসে হয়ে আছে।
-কি হয়েছে?
-দেখ, পুতুল কথা বলছে না। চোখও খুলছে না, কিন্তু জেগে আছে।
জাহানারা বেগম দৌড়ে গেলেন, পুতুলের মুখে হাত বুলালেন।
-মা কি হয়েছেরে?
পুতুল চুপ। জাহানারা বেগম এবার ভয় পেয়ে গেলেন। দ্রুত মেয়ের পিঠে আর গলায় হাত বুলালেন, পিঠে হাত দেয়ার সময় পুতুল ফুফিয়ে উঠল, জাহানারার মনে হল রক্ত ছোপ ছোপ হয়ে শুকিয়ে আছে। কামিজ উঠিয়ে সেলোয়ার চেক করলেন, ছিড়ে আছে। জাহানারা বেগম চিৎকার দিয়ে উঠলেন,
-তুমি যাও এখান থেকে, যাও। দরজা বন্ধ করে যাও।
সেলিম সাহেব প্রচন্ড ভয় নিয়ে রুম থেকে বের হলেন, বের হয়ে দরজা আবছা করে টেনে দিলেন। কি হয়েছে তিনি বুঝতে পেরেছেন, তিনিও একজন বাবা। কিন্তু সেটা তিনি ভুল হোক এই আশা করছেন। সোজা রুমে গিয়ে প্যান্ট পড়লেন। আলমাড়ি থেকে পাঁচশত টাকার একটা বান্ডিল নিলেন। কাউকে ফোন করা দরকার নেই। জীবনে কিছু যুদ্ধ একা একা করতে হয়, কাউকে জানানো যায় না। বাসার বাইরে গিয়ে একটা সিএনজি ঠিক করলেন, এরপর বাসায় ফিরে আসলেন। দরজার তালা খুলে চাবিটা পকেটে রাখলেন।
পুতুলকে তখন তাঁর মা বিছানায় উঠানোর চেষ্টা করছেন, পুতুল নড়ছে না। সেলিম সাহেব পুতুলকে কোলে তুলে নিলেন। হেটে সোজা বের হয়ে যাচ্ছেন।
-জাহানারা তালাটা বন্ধ করে দাও, আমি চাবি পকেটে নিয়েছি।
সেলিম সাহেবের ঠান্ডা গলা শুনে জাহানারা বেগম ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি সেলিম সাহেবের পিছু পিছু খালি পায়ে বের হয়ে এলেন। দরজার কড়ায় ঝুলন্ত তালাটা কাপা হাতে আটকিয়ে সোজা সিএনজিতে উঠলেন । সারাটা পথ জাহানারা বেগম কেঁদেছেন, সেলিম সাহেব চুপ করে জাহানারা বেগমের দিকে তাকিয়ে আছেন। সিএনজিওয়ালার হাত কাঁপছে , সে সিএনজি দ্রুত চালানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছেনা। একটা ভয় তাকেও গ্রাস করেছে;
অদৃশ্য এক ভয় ।
হাসনাত মহা খুশি। সে প্রেমের প্রথম অধ্যায় সুন্দরভাবে শেষ করেছে । তাঁর ধারনা পৃথিবীর কোন ছেলে অল্প সময়ে পুতুলের জন্য বেহালা শিখার গ্রামারটা আনতে পারবে না। অসম্ভব, নিজেকে অনন্ত জলিল মনে হচ্ছে। অসম্ভবকে সম্ভব করাই যার কাজ। নুজাতের হাতে বইটা দিতে হবে। কাজ যত দ্রুত করেছে বইটা তত দ্রুত পৌছাতে হবে পুতুলের হাতে।
-নুজাত, কই তুই।
নুজাত ব্যায়াম করছিল। ব্যায়াম না ঠিক, ধ্যান বলা যায়। সোজা হয়ে শুয়ে থেকে হাত দুইটি রেললাইনের মত সমান্তরাল রেখে পাঁচ সেকেন্ড পরপর বড় নিঃশ্বাস নেয়া। এতে নাকি রাগ কমে। নুজাতের রাগ বেশী এটা নুজাত নিজেও বুঝতে পারে। বুঝতে পারে বলেই গোপনে এই কাজগুলো করে। বুদ্ধিটা পেয়েছিল সে পুতুলের কাছ থেকে। পুতুল নাকি ডিসকভারি চ্যানেলে দেখেছে।
-চিল্লাস কেন? আস্তে কথা বলতে পারিস না?
-এত ধ্যান করেও মেজাজ কমল না, তাহলে ধ্যান করার দরকার কি। বাদ দে। উঠে বস।
-না, যা বলার বল। বিরক্ত করিস না।
হাসনাত টেনে বসিয়ে দিল নুজাতকে। হাতে বেহালার গ্রামার বইটা দিয়ে বলল, দেখ কি এনেছি?নুজাত এবার সত্যিই বিরক্ত হল। এই বই নিয়ে এত রাতে চিৎকার করার মানে কি। বেকুব ছেলে। শুধু বেকুব না, বেকুবের হাড্ডি । নুজাত বইটা হাতে নিল, টেবিলের উপর রাখল এবং দরজা বন্ধ করে দিল।
হাসনাত বুঝতে পারছেনা সে ভুলটা কি করেছে। ভুল বই আনেনি ত? লিখা ত আছে ‘১৯ দিনে বেহালা শিখুন’। ভুল হবার ত কথা না ।
হাসনাত নিজের রুমে চলে এল। ল্যাপটপ ওপেন করে ছবি দেখা যায় পুতুলের। প্রেমের সবচেয়ে স্বর্গিয় সময়টা হল শুরুর দিকটা, এটা আসহাবের থিউরি। তাঁর কথা হচ্ছে যত আবেগ, নাটক আর প্রেম এই সময় দেখানো হয়। এই সময় তাঁর চুল ঘুম থেকে উঠার পর এলোমেলো থাকলে পরীর মতন লাগে, ফকিরের ড্রেস পড়ে রাস্তায় বের হলেও রাজকন্যা লাগে। প্রেম হয়ে গেলে কিংবা বিয়ের পর হবে ঝগড়া, তখন ঝগড়াটাই হল আসল ভালোবাসা। হাসনাত অবশ্য এই থিউরি মানে না। তাঁর ধারনা ঝগড়া করার মত সাহস তাঁর নেই।
সুতরাং, সুন্দর একটা জীবন কাটাবে তারা দুজন।
হাসনাতের বিরক্ত লাগছে, এটা তাঁর লাস্ট সেমিস্টার। কিন্তু, সেই হিসেবে পড়ালিখা হচ্ছেনা। বইয়ের পাতায় এখন পুতুল থাকে, বাথরুমের শাওয়ারের পানিতে পুতুল থাকে, তাঁর কিনা জামা-কাপড়েও পুতুলের আবেশ মিশে থাকে।
- হাসনাত এদিকে আয় ।
রফিক সাহেব গম্ভীর ভাবে ডাকছেন । এই ডাকটা সাধারণ না। এই ডাকের অর্থ হল, ‘এদিকে আয়। কিছু উপদেশ দিচ্ছি, সেই অনুযায়ী কাল থেকে চলবি’।
-আব্বু বল।
-আব্বু আব্বু ডাকবি না, আমি তোর দাদাকে ডাকতাম আব্বা। পুরুষ মানুষের কথা বলার মধ্যেও থাকবে পৌরষত্ব, আর তোর বাপ ডাকার মধ্যেও মেয়েলি ভাব।
হাসনাত ভয় পেয়ে গেল। রফিক সাহেবের মেজাজ খারাপ বুঝতে পারছে। তাঁর এলাকার বড় ভাই রোজেন কিছুদিন আগে জাতীয় বক্সিং চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তিনি রাস্তায় হাটলে সবাই তাকে সমীহ করে চলেন। লোকমুখে শোনা যায় সিফাত রাত এগারোটা থেকে বারোটা পর্যন্ত নিয়ম করে এক ঘন্টা দৌড়াদৌড়ি করে, আর ঠিক এই জন্যেই তাদের এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেনা। মজার ব্যাপার হল সিফাত ভাই তাঁর বাবাকে আব্বু ডাকে। ব্যাপারটা রফিক সাহেবকে বলা যাবে না। মুখে মুখে তর্ক আব্বু পছন্দ করেনা।
-পরিক্ষ্যা কখন।
-আগামী মাসে।
-এরপর?
-এরপর শেষ।
-কি শেষ?
-বিবিএ
-আগামী মাসের কয় তারিখে শেষ হবে পরিক্ষ্যা?
-সাত তারিখ।
-আট তারিখ সকাল থেকে রেস্টুরেন্টে বসবি । আমি তোর সাথে ঠিক একমাস বসব। এরপর ব্যাবসা তুই সামলাবি।
হাসনাতের আবার হাত-পা অবশ হয়ে গেল। ইদানীং কি শুরু হয়েছে। এখন হল তাঁর প্রেমের সময়, এই সময় ব্যবসা কেন আসবে? তাছাড়া তাঁর ইচ্ছে ব্যবসা দেখবে নুজাত। সে চাকরী করবে। কি বিপদ ! তাছাড়া আব্বু একমাস কেন বসবে? তাঁর বয়স মাত্র পঞ্চান্ন হয়েছে। এত তাড়াতাড়ি অবসর নিয়ে কি করবে। হাসনাতের বন্ধু আসহাবের বাবার বয়স বাষট্রি। তিন ভাইয়ের মধ্যে আসহাব সবার ছোট। কিন্তু আসহাবের বাবা এখনো গ্রামে কৃষি কাজ করে। আসহাবের কাছে শুনেছে তাঁর বাবা নাকি সত্তর কেজি ওজনের বস্তা এখনো কাধে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
আর তাঁর বাবা নিবে পঞ্চান্ন বছর বয়সে অবসর। আনফেয়ার।
নুজাত সব শুনেছে । তাঁর ধারনা আব্বু ঠিক কাজটাই করেছেন। তাঁর বাবা রফিক সাহেব সৎ মানুষ। ত্রিশ বছর আগে বেকার অবস্থায় এসেছেন ঢাকাতে। অনেক চেষ্টার পর একটা রেস্টুরেন্টে ক্যাশিয়ারের চাকরী পেয়েছেন। আজ তিনি শহরের নাম করা একটা রেস্টুরেন্টের মালিক। তাঁর ভাই এই ব্যবসা থেকে দূরে থাকতে চাইত সবসময়, কিন্তু এই ব্যবসা তাকেই করতে হবে ব্যাপারটা তাঁর বুঝা উচিৎ । নুজাতের পক্ষ্যে সম্ভব না বিয়ের পর এসব দেখাশুনা করা।
হাসনাত রুমে গিয়ে বসল। তাঁর মনে এখন ধারনা চলছে বাবুর্চী আর ওয়েটারদের চিৎকার চেঁচামেচি। তাঁর উপর কি নির্যাতন যাবে এটাই ভাবছে সে। আচ্ছা ব্যবসা করলে পুতুল কে কি সময় দেয়া যাবে? পুতুল ত বাসায় একা একা থাকবে, তখন? কি করছে মেয়েটা এখন?
রাত তিনটায় হাসপাতালে কখনো কাটানো হয়নি জাহানারা বেগমকে। পুতুল হবার সময়েও নরমাল ডেলিভারি ছিল। হাসপাতাল ব্যাপারটা তাঁর পছন্দ না। জীবনের প্রয়োজনে তাকে আজ হাসপাতালে কাটাতে হচ্ছে। ইমার্জেন্সি ডাক্তারের নাম সিফাত। অল্প বয়সি মেয়ে, বোধহয় পড়ালিখা শেষ করে ঢুকেছে। গোল গোল টমেটোর মত মুখ। দেখলেই রোগীর সমস্যা অর্ধেক শেষ হবার কথা, সারাক্ষন হাসে। ডা. সিফাত সময় নিয়ে ভাল করে দেখছেন পুতুলকে। অনেকক্ষণ কথা বলার চেষ্টা করেছেন। মেয়ে কথা বলেনি তাই জাহানারা বেগমকে রুম থেকে বের করে কথা বলার চেষ্টা করছেন।
পুতুল কথা বলছে না। প্রায় ঘন্টা খানেক পর ডা, সিফাত চেম্বারে বসলেন জাহানারা বেগম আর সেলিম সাহেবকে নিয়ে। সেলিম সাহেব এতক্ষন বারান্দায় বসে ছিলেন, তাকে ভিতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছেনা। সেলিম সাহেবের মাথাও তেমন কাজ করছেনা , ঝাপসা লাগছে পৃথিবীটা । ডা, সিফাত সামনে রাখা কাগজ ঘেটে জিজ্ঞেস করলেন।
-কি হয়েছিল?
-জানিনা ম্যাডাম। মেয়ে ত হাসিখুশি বের হয়েছে। বাসায় আসার পর থেকে রুমের ভেতর কথা নেই চুপচাপ বসে আছে।
-কিছু বুঝেছেন আপনি?
জাহানারা বেগমের চোখে পানি চলে আসল। ম্যাডাম বুঝছি। কিন্তু, খোদার কাছে চাই এরকম কিছু না হোক।
-মা শক্ত হোন। আপনি যা ভাবছেন তাই হয়েছে। মেয়ে খুব ভয় পেয়েছে, প্রচন্ড ভয় পেলে অনেক সময় মানুষ কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। এটা একটা মানসিক সমস্যা, কখনো এই সমস্যা ঘন্টা খানেক থাকে, কখনো কয়েক দিন। আবার অনেক সময় বছরের পর বছর এই সমস্যা থেকে যায়। আপনারা পুলিশ ফাইল করান।
জাহানারা সেলিম সাহেবের দিকে তাকালেন। সেলিম সাহেব এখনো চুপ। কিন্তু, এইবার মুখ খুললেন,
-না। পুলিশ ফাইল আমরা করব না। আমার মেয়ের ভবিষ্যতের ব্যাপার। যা জানার আমি আমার স্ত্রী আর আপনি জানেন। মানুষ জানাজানি করে মেয়ের ভবিষ্যত নষ্ট করব না।
-পুলিশ ফাইল না করলে কিভাবে জানবেন এই অন্যায় কে করেছে?
-জানব। মেয়ে আমার একদিন না একদিন কথা বলবেই, সেদিন আমি জানব।
-জেনে কি লাভ? পুলিশকে যদি নাই বলেন, এই ঘটনা অন্যদের সাথেও ঘটতে পারে।
-আপনি আমার মেয়ের চিকিৎসা শেষ করুন। আমি আমার মেয়েকে বাসায় নিয়ে যাব। প্লিজ, আপনার পায়ে পড়ি ম্যাডাম। সেলিম সাহেব সত্যিই তাঁর মেয়ের বয়সী ডাক্তারের পা ধরতে চাইল।
-শুনুন। তাঁর আর কোন চিকিৎসা নেই আপাতত। কথা বলে কিনা দেখুন, নাহলে এই কার্ডটা রাখুন । এক সপ্তাহ পরেও কোন সমাধান না হলে উনার কাছে যাবেন। উনি নামকরা মানসিক ডাক্তার।
-ম্যাডাম শুকরিয়া, আমি সিএনজি নিয়ে আসছি। জাহানারা তুমি সব গুছিয়ে রাখ।
সেলিম সাহেব সিএনজি ধরাতে গেলেন। সিএনজি নিয়ে মেয়ে আর স্ত্রী কে নিয়ে বাসায় গেলেন। জাহানারা বেগম মেয়েকে নিজ হাতে গোসল করালেন, ওষুধ খাওয়ালেন । রাত দুইটা চল্লিশ মিনিটে তিনি ক্লান্ত শরীর নিয়ে মেয়েকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়লেন।
সেলিম সাহেব দুই গ্লাস পানি খেয়ে কিছুক্ষন সোফায় বসলেন। কাল অফিসে যাবেন না। মেয়েকে সময় দিতে হবে, ডাক্তার বলেছেন মেয়ের মানসিক অবস্থা উন্নতি করার প্রয়োজন বেশী। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গ্রামের বাড়ি চলে যাবেন, চাকরী থাকুক। গ্রামে মুদি দোকান দেয়ার মত সামর্থ তাঁর আছে। মেয়েকে এই শহর থেকে দূরে নিয়ে যেতে হবে। সেলিম সাহেব গোসল করলেন, এশার নামাজ পড়লেন। দশ রাকাত নফল নামাজ পড়ে শুয়ে গেলেন। পরদিন সকালে তিনি আর উঠলেন না।
রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ।
মধ্যবিত্ত একজন পুরুষ সুখি হতে পারেন না। যদি ভুলেও ছোট সংসার নিয়ে তিনি সুখি হয়ে যান, তবু প্রকৃতি তাকে শাস্তি দিবেই। সেলিম সাহেব মধ্যবিত্ত পুরুষ হয়ে মৃত্যু দিয়ে সেই শাস্তি পেলেন। জাহানারা বেগমের হাহাকার আর বিলাপ সেলিম সাহেবকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। সবাই হতবাক থাকলেও, নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিল শুধু পুতুল।
পিতার রাজকন্যা পুতুল ।
দুই বছর পরঃ
জাহানারা বেগম ভাত খিচুড়ি বসাচ্ছেন চুলোয়। আজ মেয়ের জন্মদিন। তাঁর স্বামী মারা যাবার পর দুই বছর ধরে এই ঘরে খিচুড়ি রান্না হয়নি । তারা এখন গ্রামের বাড়ি থাকে, সেলিম সাহেবের লাশ নিয়ে এসেছিল বাড়িতে দাফন করার জন্যে, আর যাওয়া হয়নি। জাহানারা বেগম স্বামী একা রেখে যেতে রাজি না। পেনশন আসে প্রতি মাসে, সেই টাকা দিয়ে মা-মেয়ের সংসার ভালই যাচ্ছে।
-জাহানারা।
সেলিম সাহেবের বড় ভাই। জাহানারা আর পুতুলকে এখন দেখে রাখে। জসিম সাহেব অসম্ভব ভাল একজন মানুষ। তাঁর এক ছেলে চার মেয়ে। চার মেয়ের বিয়ে দেয়া শেষ, ছেলে এখন বাজারে চাল দোকানে বসে। ভাল আয় আছে। ছেলের বিয়ের কথা উঠেছিল, কিন্তু জসিম সাহেব সরাসরি বলেছেন আমার আরেকটা মেয়ে বাকি আছে। তাকে বিয়ে দেয়া ছাড়া ভাইয়ের বিয়ে হবেনা। তিনি পুতুলকে অসম্ভব ভাল জানেন।
পুতুল এখনো কথা বলতে পারেনা। জাহানারা বেগম জীবনের কঠিন বাস্তবতাটাকে মেনে নিয়েছেন। যখনি পুতুলের মন খারাপ হবে বেহালা নিয়ে বসে যায়। পুতুলের হাতে বেহালা এখন অন্যরকম বাজে। নুজাত তাঁর বাবা-মায়ের সাথে দুইবার এসেছিল এরমধ্যে পুতুলদের বাড়িতে। পুতুলকে দেখে গেল, আর সাথে হাসনাতের জন্যে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে গেল।
-ভাবি ছেলে আমার বেকুব। শুধু বেকুব না, বেকুব গোস্টির সভাপতি। এই বেকুব ছেলে সাহস করে কখনো আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেনি। ঈদের সময় যদি সাদা জুব্বা কিনে পড়ায় রাখতাম, হাসনাত সেই জুব্বা পড়ে ঘুরাঘুরি করত। তবুও মুখ ফুটে কখনো বলেনি সে রঙিন পাঞ্জাবী পড়বে। সেই ছেলেকে আমি ব্যাবসায় বসিয়েছি, এখন আমার ব্যাবসা সে নিজেই দেখে। ভাবি ছেলেটা জীবনে একটা ব্যাপার নিয়েই জিদ ধরেছে, আপনার মেয়েকে বিয়ে করবে।
ভাবি ছেলেটা আমার কথা শুনবে না, মায়ের কথা শুনবে না। ভালোবাসে সে পুতুলকে। ফিরায়া দিয়েন না। বেকুবদের জিদ একটু বেশী হয়। সে পুতুলকে বিয়ে করবে মানে করবেই। নাহলে অন্য কাউকে করবে না।
জাহানারা বেগম চুপ ছিলেন। হাসনাতকে তিনি ভাল ভাবেই চিনেন। সেলিম সাহেবের মতন সহজ সরল একজন মানুষ। নুজাতদের পরিবারও ভাল । সমস্যা হল মেয়েকে আর কয়েক বছর রাখতে চান নিজের কাছে। এই মেয়ের দেখ ভাল এখন তাঁর চেয়ে ভাল কেউ পারবে না।
নুজাতের বিয়ে হয়েছে গত বছর। নুজাতের ইচ্ছে ছিল রাজনীতি করার, তাঁর ইচ্ছে পূরণ হয়নি । সে এখন উত্তরায় থাকে স্বামীর সাথে। নুজাত বিয়ে করবেই না, বাবার ধমক মায়ের আদর কিছুতেই কাজ হয়নি। যখন ছেলে দেখতে আসল, স্ট্রেট বলে দিল দেখা করবে না। সেই ছেলে ছিল রাজপুত্র, কথায়, দেখায় আর চলাফেরায়। নুজাত সেই রাজপুত্রকে আড়াল থেকে দেখে এবং সুন্দর করে নিজেকে সাজিয়ে সেই রাজপুত্রের সামনে আসে।
নুজাত প্রথম বার এসে বেহালা শিখার বইটা দিয়ে গেছে। তখন পুতুলকে জানিয়েছে হাসনাত এখন পোক্ত ব্যাবসায়ী । পরিক্ষ্যা শেষে বাবার ব্যাবসায় বসেছে এবং গত দুই বছরে নতুন আরেকটা শাখা খুলেছে ধানমন্ডিতে। আশরাফ খিচুড়ি আর গরুর মাংসের জন্যে দুইজন আলাদা এক্সপার্ট বাবুর্চি রেখেছে। এদের কাজ হল পুতুলের পছন্দ মত গরুর গোস্ত আর খিচুড়ি রাঁধবে ।
পুতুল সব শুনে যায়, তাঁর মাথায় এখন গভীরভাবে কিছু ঢুকে না। সে বেহালা শিখার বই পেয়ে খুশি। পরের বার যখন নুজাতরা আসে তখন সে নুজাতকে বেহালা বানিয়ে শুনিয়েছে। নুজাতের বাবা সেই বাজনা শুনে কেঁদেছিল । কাঁদতে কাঁদতে ঘর ছেড়ে গাড়িতে উঠে।
জাহানারা বেগম জসিম সাহেবের কাছে গেলেন।
-ভাইজান, ডেকেছিলেন?
-হ্যাঁ। জাহানারা খিচুড়ি রাঁধছ?
-জ্বী।
-গরুর গোস্ত ?
-না ভাইজান।
-আরিফকে দিয়ে গরুর গোস্ত আনিয়েছি। নিয়ে যাও। পুতুলকে খাওয়াও।
-ভাইজান থাক না।
-থাকবে কেন? পুতুল আমার ঘরের মেয়ে। পর ভাব কেন? যা বলছি কর।
জাহানারা বেগম ভিতরে গেলেন। গরুর গোস্ত নিয়ে পানিতে ভিজালেন। তাঁর হঠাত করে মাথা ঝিমঝিম করছে। চারদিকে কেমন জানি ঘুরছে, চোখ ঝাপসা ঝাপসা লাগছে। গত দুইবছর অনেক ধকল গেছে তাঁর উপর দিয়ে। হঠাত বিপদে পড়া অসুস্থ মেয়েকে তাঁর কাছে একা রেখে সেলিম সাহেব মারা যান। এরপর থেকে একা একা শোক নিয়ে মেয়েকে সেবা করে যাচ্ছেন। অনেকদিন ধরেই শরীর খারাপ যাচ্ছিল, শুধু মেয়ের জন্যেই মনের জোরে চলাফেরা করছেন ।
-জ্যাঠি । জ্যাঠি কি হইছে? মাথা ঘুরায়?
জাহানারা বেগম ঝাপসা চোখে দেখলেন আরিফ আসছে। নাহ, চেষ্টা করেও নিজেকে ধরে রাখতে পারছেন না। রান্নাঘরেই জাহানারা বেগম মারা গেলেন। গরুর ঝাল গোস্ত আর রান্না হল না।
পুতুলের কেমন জানি লাগছে। মা মারা গেছে ব্যাপারটা তাকে ধাক্কা দিয়েছে। সে কাঁদছে প্রচুর। জসিম সাহেব ঘোষনা দিয়েছেন পুতুল কাদার সময় কেউ যাতে বিরক্ত না করে। যত কান্না, তত হালকা হবে। পুতুল আসলেই কান্না করতে করেতে একসময় বাস্তবতা মেনে নিয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে তাঁর বাবা-মা কেউ বেচে নেই এবং নিজেকে ইদানীং অপরাধী মনে হয় কারন, তাঁর ধারনা দুইজনিই তাঁর কারনেই মারা গেছেন ।
জসিম সাহেব রফিক সাহেবকে খবর দিয়ে ঢাকা থেকে আনিয়েছেন। গম্ভীর গলায় বলেছেন পুরা পরিবার নিয়ে আসবেন। রফিক সাহেব পুরা পরিবার নিয়ে এলেন। জসিম সাহেব সমাজের মুরুব্বীদের সামনে রেখে পুতুলের বিয়ে দিলেন হাসনাতের সাথে। পুতুলের না ছিল না। সে বুঝেছে এখন তাকে অন্য আশ্রয়ে যেতে হবে, তাছাড়া তাঁর মা প্রায় হাসনাতের কথা বলতেন। জসিম সাহেব সকল মুরুব্বির সামনে বলেছেন পুতুলের মা সবসময় বলত আমি না থাকলে পুতুলকে এই ছেলের হাতে তুলে দিবেন। আমি আমার কাজ সম্পাদন করলাম।
রাতে যখন রফিক সাহেব সব ঝামেলা ছেড়ে গাড়ি নিয়ে চলে আসছেন, তখন জসিম সাহেব তাঁর হাত ধরে আড়ালে নিয়ে এলেন। ফুফিয়ে ফুফিয়ে কেঁদে বললেন,
-ভাই মেয়েটা বড় অভাগা। এই মেয়ে দুই বছরে বাপ-মা সব হারাইছে, অনেক বড় বিপদ থেকে আসছে এই মেয়ে। এই মাইয়াটারে কোন কষ্ট দিয়েন না। আপনাদের দাবী লাগে। আপনি চাইলে আমি আপনার ঘর সাজাই দিমু। খাট, আলমারী সব দিমু।
রফিক সাহেব অনেক শক্ত একজন মানুষ। মেজাজী হিসেবে সবাই তাকে ভয় পায়। তিনি জীবনে অনেক বাস্তবতা পার হয়ে নিজেকে এই অবস্থানে এনেছেন। আজ তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর চোখেও পানি। তিনি জসিম সাহেবের হাত শক্ত করে চাপ দিলেন।
-ভাইসাব, পুতুল আমার মেয়ে।
জসিম সাহেব সে রাতে খেলেন না। কিছুক্ষন পরপর পুতুলের স্বামীকে ফোন দেন। পুতুলের সাথে কথা বলেন। হুট করে মনে হল জামাই মানুষ খারাপ মনে করবে এতবার ফোন দিলে। তিনি মন খারাপ করে ফেললেন। পুতুলকে একটা মোবাইল কিনে দেয়া দরকার ছিল।
-ও আরিফ। আরিফরে।
-আব্বা বলেন।
-কাল বাজারে গিয়া একটা দামি মোবাইল কিনবি। সে মোবাইল পাঠাবি পুতুলরে।
-আব্বা পাঠাব। আপনি ভাত খান।
-তুই মোবাইল পাঠাবি, এরপর আমি ভাত খামু। ততক্ষন আমি রোজা।
হাসনাতের কাছে সব কিছু অন্যরকম স্বপ্ন মনে হচ্ছে। গত দুই বছর সে পুতুলকে দেখেনি, আজ দেখেছে তাও বউ সাজে। যেই সাজে সে এখন হাসনাতের ঘরে বসে আছে। এতক্ষন নুজাত সহ গল্প করছে, ভাবি ননদ বান্ধবী হলেও সমস্যা। হাসনাত ঢুকতেই পারছিল না রুমে, বজ্জাতটা বের হচ্ছিল না। নুজাত বের হতেই সে রুমে আসল। রাত গভীরে সে যখন পুতুলের চিবুক ধরে উঠাল এবং পুতুলের বাম চোখের তিল দেখে দ্বিতীয়বারের মত তাঁর প্রেমে পড়ল ।
নুজাতদের ঘরের নতুন সদস্য মিসেস হাসনাত। উনি এখন শাশুড়ির সাথে রান্নাঘরে বসে । শশুর তাকে প্রতিদিন সকালে পত্রিকা পড়ে শুনায়। রফিক সাহেব এবং তাঁর স্ত্রী মোটামোটি সুখেই আছেন। ছেলে সারাদিন থাকে রেস্টুরেন্টে, মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে। তবু তাদের একা থাকতে হয়না পুতুলের জন্যে। ইদানীং পুতুল আর তাঁর শ্বশুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাসার সামনে উঠানে ফুলের ছোট বাগান করবে। যেই ভাবা সেই কাজ।
নুজাত এসেছে । পুতুল নুজাত আসলেই খুশি। নুজাত বকবক করে সারাক্ষন জামাইয়ের গল্প বলবে, পুতুল হা করে শুনবে। রাতে হাসনাতসহ আড্ডা দিচ্ছিল তারা। হাসনাত পুতুলকে নিয়ে বসে আছে সোফায়। পুতুলের কাধে হাসনাতের হাত, কাঁধে হাত রাখলে চুল স্পর্শ করা সহজ। হাসনাতের ধারণা পুতুলের চুল ধরে রাখলে নিজেকে নিষ্পাপ মনে হয়। তাঁর বোন বকবক করে যাচ্ছে।
-আজ আমি নাই ত, দেখবি বাসায় সবার সাথে ঝগড়া করবে। তাঁর কথা হল আমি সারাক্ষন তাঁর সাথে থাকতে হবে, এটা সম্ভব কখনো? আমার দাদী শাশুড়ি বলছে মাঝেমধ্যে দূরে থাকা ভাল। তাহলে আন্তরিকতা বাড়ে। দাদী সারাক্ষন পান খাবে আর বকবে। মিনিটে মিনিটে পান। এরকম পান খাইতে পারে মানুষ আমার জানা ছিল না। পুতুল মনে পড়ে? আরেকজন ছিল। আমাদের গণিত স্যার। সালাম স্যার। মনে আছে? পাঁচ মিনিট পরপর পান খেত?
হাসনাত খেয়াল করল পুতুলের শরীর কেপে উঠছে। পুতুলের মুখ থেকে হাসি দূর হয়ে গেছে। ব্যাপারটা অবাক লাগল হাসনাতের। সে বুঝার জন্য আবার জিজ্ঞেস করল,
-কোন স্যার?
-আরেহ সালাম স্যার। ব্যাটার কপাল ভাল আমি শিক্ষ্যামন্ত্রী হইনি। হইলে তারে শিক্ষক সমাজ থেকে বের করতাম এই পান খাওয়ার জন্যে।
পুতুলের শরীর কাঁপছে এখন। হাসনাত দুই হাত দিয়ে ধরল পুতুলকে। পুতুল ভয় পেয়েছে কোন কারনে। কুকরে যাচ্ছে। হাসনাত দ্রুত তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। লাইট অফ করে তাঁর হাত ধরে বসে থাকল। হাসনাতের স্পষ্ট খেয়াল আছে সেদিনের কথা। নুজাত আর পুতুল দুইজন মিলে প্রাইভেটে যাচ্ছিল। কিন্তু, পুতুলের মা একবার জিজ্ঞেস করেছিল নুজাতকে পুতুল সেদিন কোথায় গিয়েছিল। নুজাত স্পষ্ট বলেছে তারা দুজন একসাথে প্রাইভেট পড়ে বের হয়ে গলির মাথা থেকে যে যার বাসায় হাটা দিয়েছিল।
সারারাত হাসনাত পুতুলের হাত ধরে কাটাল। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে,ঘুমন্ত অবস্থায়ও বুঝা যাচ্ছে সে অনেক ভয় পেয়েছে। হাসনাত শেষ রাতে ফোন হাতে নিল, ফোনের মেসেজ অপশনে গিয়ে ছোট্র করে একটা মেসেজ দিল,
‘কাল সকালে আয়’
আসহাব এখনো আগের মতই। পড়ালেখা শেষে গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ করছে। খুব সুখি মানুষ, এখন মোবাইল ব্যবহার করে। তাও কল করলে সবসময় ধরে না। এইজন্যেই মেসেজ দিয়ে রাখতে হয়। আসহাবের বাড়ি গাজীপুরে। এই মেসেজটা সে সকালে উঠেই পাবে এবং সকাল সকাল ঢাকা পৌছাবে । আসহাবের বিয়ে হয়েছে, সংসার আছে তবুও আগের স্বভাব যায়নি। এখন সাহয্যের জন্য কেউ অনুরোধ করলেই সে হাজির।
আসহাব সুন্দর করে এফোর কাগজে লিখল, ‘স্যার বাইরে। আজ পড়ানো হবেনা।‘ লাল মার্কার দিয়ে লিখা এই কাগজটা গণিত শিক্ষক সালামের দরজায় লাগানো হচ্ছে। বাচ্চারা এই কাগজ পড়ে ছুটি, গরম গরম রুটি বলে দৌড়াবে। হাসনাত চুপ করে আছে, আসহাবের যা খুশি করুক। সে রুমের মধ্যে একটা চেয়ারে বসে আছে পা তুলে। তাঁর ঠিক অপর পাশ্বে চেয়ারে হাত-পা বাধা অবস্থায় বসে আছে সালাম, সামনে ক্যামেরা রেকর্ড চলছে। এই কাজটা আসহাবের, তাঁর ধারণা এই ধরনের শিক্ষক অপরাধ করলে একটা করেনা, অগণিত করে। তাই সব কিছু রেকর্ড রাখা ভাল।
-আমি বাবা গরীব শিক্ষক। আমার কাছে এত টাকা নেই যা তোমাদের সন্তুষ্ট করবে। তোমরা ভুল জায়গায় এসেছ বাবা।
-আমি ঠিক জায়গাতেই এসেছি। সালামের কাছে, যার কাজ হল বাচ্চা মেয়েদের অংক শিখানো। তাঁর আরেকটা কাজ আছে, যেটা কেউ জানেনা। সেই কাজটা আজ সবাই শুনবে। বল, আমাকে গল্প শুনা। তুই নাকি গল্প শুনাতে ওস্তাদ।
-কি গল্প বাবা?
-পুতুলের গল্প। সাত জুলাই ২০০৯ এর গল্প।
মুজিবুরের চোখে ভয় দেখা গেল। আসহাব এক খিলি পান তাঁর মুখে দিল।
-শুরু কর গল্প।
-কিসের, কিছুই ত বুঝতে...
সালাম কথা শেষ করতে পারল না, তাঁর পিঠে চুরি দিয়ে এঁকে দিয়েছে হাসনাত । আসহাব হাতে লবন আর মরিচ নিয়ে সালামের চোখের সামনে মিক্সড করছে। মিক্সড করার পর পকেট থেকে বরই বের করল। লবন মরিচের মিশ্রনের সাথে বরই খাওয়া আসহাবের পছন্দের।
-সময় নাই বেশী, যা করার তাড়াতাড়ি কর। আর দশ সেকেন্ড পরে আমি তোর পিঠের কাটা জায়গায় লবন মরিচের মিক্সডটা দিব।
সালাম ভয় পেয়ে গেল। তাঁর চোখ লাল হয়ে আছে। সেই লাল চোখ নিয়ে বলল আমি কি বলতাম ? কিছুই ত জানিনা। আসহাব এবার সত্যিই তাঁর হাতের লবন মরিচের মিশ্রন সালামের পিঠে ঢেলে দিল। সালাম গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করল। আসহাব তাঁর মুখ চেপে ধরে বলল, এবার লবন মরিচ তোর আসল জায়গায় দিব। কি হইছিল সেদিন বল। সালাম এবার গোজ্ঞানীর সাথে বলতে শুরু করল;
-সেদিন আমার মেজাজ ফুরফুরে ছিল । আমি মাসে একবার বউকে বাপের বাড়িতে রেখে আসি। ছেলে মেয়ে নাই, বউয়ের উপর এমনিতে মেজাজ থাকে গরম। তাই বউ সব জেনেও চুপ থাকে। বউকে যখন রেখে আসি সেদিন আমি কোন একটা স্কুলের বাচ্চাকে রেখে দিতাম। এক্সট্রা ক্লাস করানোর জন্য যে মেয়েটাকে রাখা হত, সেই মেয়েটাই আমার ভোগের জন্যে সেদিন বরাদ্দ থাকত।
সেদিন প্রাইভেট পড়াইনি । মেজাজ খুব ভাল ছিল তাই গল্প শুনিয়ে ছেড়ে দিয়েছি সবাইকে। সবাই যাবার পর সেদিন একটা মেয়ে আসার কথা। সেই মেয়েকে ভয় দেখিয়ে আমি প্রায় আনাই ঘরে। দরজায় টোকা পড়তেই দেখি পুতুল দাঁড়িয়ে আছে, সেই মেয়ে আসেনি। পুতুল মোবাইল রেখে গিয়েছিল , তা নেয়ার জন্যে এসেছিল।
আমি পুতুলকে দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। সে ভিতরে ঢুকার পর আমি দরজা আটকিয়ে দিই। তারপর তাঁর হাত ধরি। পুতুল ভয় পেয়ে বের হয়ে যেতে চায়। আমি তাকে ভিতরের রুমে নিয়ে ফ্লোরে ফেলে দিই। সে চিৎকার করে উঠে। পুতুল অন্য মেয়েদের মত ভয়ে চুপ ছিল না। চিৎকার করছিল। আমি ভয় পেয়ে গিয়ে তাঁর ঠোট কামড়ে ধরি। পুতুলের শরীরে অন্যরকম একটা ঘ্রাণ ছিল। আমি মাতাল হয়ে যাই, সব শক্তি দিয়ে তাকে রেপ করি। হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে পুতুলের সেলোয়ার ছিড়ে যায়। পুতুলের পিঠে নখ দিয়ে আচড় কাটি যেন ব্যাথা পেয়ে চুপ থাকে। তাঁর চোখ ভয়ে বড় হয়ে আসছিল, আমার ঠোট কামড়ে রাখা অবস্থায় গোজ্ঞাচ্ছিল।
অবাক ব্যাপার হল রেপ করার পর পুতুল ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। কোন কথা নেই, বুঝলাম ভয় পেয়ে গেছে বেশী। আমি তাকে উঠিয়ে পানি খাওয়ালাম, হাত-মুখ ধুইয়ে বের করে দিলাম। পরে স্কুলে শুনলাম পুতুল ভয়ে কথা বলতে পারেনা, তাঁর বাবাও মারা গেল পরদিন। তারা চলে গেছে বাড়িতে। বুঝলাম এই যাত্রায় ও বেচে গেছি। কিন্তু দুই বছর পর তাঁর কথা আসছে কেন?
হাসনাতের চোখে মুখে রক্ত। কোন পুরুষ তাঁর নারীকে অন্য কারো সাথে চিন্তা করতে পারেনা, সেখানে তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষকে ধর্ষন করা অসহনীয়। আসহাব ভয় পেয়ে গেল। সে সালামের মুখে রুমাল দিয়ে রাখল চুপ থাকার জন্যে। হাসনাত উঠে প্রথমেই তাঁর মুখ থেকে রুমাল বের করে নিল। জিহবাটা টান দিয়ে বের করার চেষ্টা করল। পান খাওয়া লাল জিহ্বা পিছলে যাচ্ছে। সে রুমাল দিয়ে এবার জিহবাটা ধরে টান দিল। সালাম গোঙানির আওয়াজ করছে। আসহাব কিছু বুঝে উঠার আগেই হাসনাত চুরি দিয়ে এক পোঁচ মেরে জিহ্বা অর্ধেক করে ফেলল।
সালামের চিৎকার শুনে আসহাব দ্রুত রুমালটা আবার তাঁর মুখে ডুকিয়ে দিল।
-কি করলি তুই। চল এখান থেকে...
-চুপ । তুই চলে যা। আমার কাজ শেষ হয়নি।
-হাসনাত শুন, শাস্তি পেয়েছে। এরচেয়ে বড় শাস্তি হবে এই ভিডিও সবার কাছে ছাড়লে। ব্যাটা কাউকে মুখ দেখানোর উপায় পাবেনা। যার যার সাথে যা করেছে সব এই ভিডিওতে আছে। আমরা পুতুলের কথাটা এখান থেকে কেটে দিব।
-নাহ।
-তুই এরে খুন করলে তোর শাস্তি হবে। লাভ কি ? পুতুল ত আবার অসহায় হবে তুই না থাকলে।
আসহাব দ্রুত সালামের হাতের বাধন কেটে দিল। চুরিটা ব্যাগে ঢুকিয় নিল । হাসনাতকে জোর করে নিয়ে বাইরে গাড়িতে উঠাল আসহাব। হাসনাতের এমন ভয়ংকর রুপ কখনো দেখেনি সে। তাঁর ভয় হচ্ছে সে খুন করবে। জিহ্বা কাটার শাস্তি যাই হোক খুন করলে তাঁর জীবন নষ্ট হবে।
গাড়ি হাতিরঝিলে সাইড করে রাখল আসহাব। সন্ধ্যা সাতটা বাঝে। দুইটা ঠান্ডা পানির বোতল এনে ওরস্যালাইন মিশাল আসহাব। পানি খেয়ে হাসনাত ঝিলের পাড়ে বসে থাকল। রাতের এই সময় হাতিরঝিলে আবহাওয়া অন্যরকম। একদিন সময় করে পুতুলকে আনতে হবে। দুজন হাত ধরে বসে প্রকৃতি দেখবে। আসহাব কাজটা ভাল করেছে, এখন বুঝতে পারছে সে। এখন সালাম মারা গেলেও তাঁর ভিতরে অপরাধবোধ থাকবেনা। কিছু হত্যা অনেক অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্তি দেয়। তখন গরম মাথায় উলটাপালটা কিছু করলে বিষয়টা পুতুলের জন্যেই খারাপ হত। এখন যা হয়েছে এটা সামলানো যাবে।
আসহাব গাড়িতে বসে ল্যাপটপ চালু করেছে। রেকর্ড করা ভিডিওটা থেকে পুতুলের ঘটনা বাদ দিয়ে বাকি সব স্বীকারোক্তি আলাদা করল । জিমেইলের নতুন একটা আইডি খুলে তা দিয়ে ইউটিউবে ভিডিওটা আপলোড দিল। এবার যা হবার হবে।
-হাসনাত বাসায় যাবি?
-কিছুক্ষন বসি।
-আচ্ছা বস।
হাসনাতের হঠাত চোখে পানি আসল।
-দোস্ত, আমার কোন ভাই নেই। তুই আমার ভাইয়ের মতন। তুই যেভাবে সাহায্য করলি আজ আমি কখনোই ভুলব না ভাই।
-আচ্ছা ভুলিস না। মনে রাখলে ভাল। তাহলে আমাকেও মনে থাকবে। হাহাহা
হাসনাত হাসি শুনছে। আসহাবের হাসিটা খুব ভাল লাগছে এখন। অসম্ভব ভাল লাগছে । আস্তে আস্তে হাসনাত নিজেও হাসি শুরু করল। কি আজব! হাসনাতের চোখেও পানি, মুখেও হাসি।
প্রশান্তির হাসি
খবরটা নুজাতের চোখে পড়েছে আগে। পুতুল আর সে দুজন মিলে টিভি দেখছিল একসাথে। টিভিতে ফলাও করে দেখাচ্ছে। রাত একটার সময় দেশে সাধারনত ব্রেকিং নিউজ হয়না। আজ হচ্ছে, আসলেই ব্রেকিং নিউজ। তাদের স্কুলের গণিত শিক্ষক সালামের একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ব্রেকিং নিউজ হল, সে আত্বহত্যা করেছে । সাংবাদিকরা বলছে তাঁর জিহ্বা কাটা, এটা আত্বহত্যা কিনা এখনো বুঝা যাচ্ছেনা। পুলিশ তদন্ত করছে।
এই দেশের সাংবাদিকরা প্রতিযোগিতা বুঝে। ব্রেকিং নিউজ পেলে সেটার পরিপূর্নতা করতে প্রতিযোগিতা হয়। এরমধ্যে এক চ্যানেলে চারজন শিক্ষ্যার্থী চেহারা না দেখানো সত্ত্বে সাক্ষাতকার দিচ্ছে। তাদের ব্ল্যাকমেইল করে কিভাবে দিনের পর দিন রেপ করা হয়েছে তাঁর বিবরণ । একটা মেয়ের কন্ঠ নুজাত চিনে ফেলেছে, তাদের ক্লাসমেট ছিল।
-পুতুল চিনসছ মেয়েটারে? তানজু্, আমাদের ক্লাসের। নুজাত পুতুলের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। আশ্চার্য! পুতুল হাসছে, শুধু হাসছে না, আনন্দে তাঁর শরীর ঝাঁকি দিচ্ছে ।
এরমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় সালামের হত্যা নিয়ে জমজমাট কথা ছড়াচ্ছে। ফেসবুকের সেলিব্রেটিরা সচল হয়েছে রাত একটায় ।
‘আরিফ আর হোসাইন’ ঘোষনা দিল সে জিহ্বা কাটা মৃত ব্যক্তিটিকে শিক্ষক হিসেবে মানেন না। তাঁর নিজেরও দুইটা মেয়ে আছে । তিনি সেই মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
সালামের ভিডিও চারিদিকে ঘুরছে। সবাই ভিডিও যিনি করেছেন তাঁর প্রশংসা করেছে। নুজাতের ব্যাপারটা খারাপ লাগছে না। সে কখনোই মুজিবুরকে দেখতে পারত না। পান চাবাতে চাবাতে তাঁর চোখের চাহনী কখনোই নুজাতের ভাল লাগেনি। হুট করেই বলেই ফেলল,
-ভালই হল, ব্যাটা বেচে থাকলেও লাভ হত না। কাটা জিহ্বা দিয়ে ত আর পান চিবানো যেত না। কি বলিস।
পুতুল হাসছে। জোরে জোরে হাসছে। নুজাত থতমত খেল, কৌতুক বলে ফেলল নাকি? পুতুলের হাসির আওয়াজ শুনে রফিক সাহেব এবং তাঁর স্ত্রী ঘুমের পোশাকে চলে আসলেন। তারা দাঁড়িয়ে পুতুলের হাসি দেখছেন। মেয়েটাকে কখনো এতটা আনন্দিত হতে দেখেননি তারা। নুজাতও আবার কাটা জিহবার কথাটা বলে নিজেও হাসা শুরু করল । পুতুল হাসছে, নুজাত হাসছে। রফিক সাহেব আর তাঁর স্ত্রীও হাসা শুরু করলেন; হাসি সংক্রামক।।
হাসনাত ঘুমাচ্ছে। সে বাসায় ফিরেছে শেষরাতে। এসে দেখল পুতুল ড্রয়িংরুমে সোফায় ঘুমাচ্ছে। নিশ্চই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। মেয়েটা দিনদিন ভালোবাসা বাড়াচ্ছে। অদ্ভুদ ভালোবাসাটা বেড়েই যাচ্ছে তাদের। হাসনাত পুতুলকে কোলে তুলে নিয়ে নিজেদের রুমে বিছানায় রাখল। কাপড় চেঞ্জ করে গোসল দিল অনেক্ষন, এরপর ডেস্পোটিন একটা খেয়ে এসে পুতুলের সাথে শুয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙল এগারোটায়। হাসনাত কখনো এত বেলা করে উঠেনি। গত দুইবছর সে সকালে উঠে নামাজ পড়ে রেস্টুরেন্টের হিসাব করত, এরপর নাস্তা করে রেডি হয়ে রেস্টুরেন্টে বের হত, ফিরত রাত এগারোটায়। হোক না একদিন অনিয়ম, সমস্যা কি? ঘর অন্ধকার করে রেখেছে পুতুল, নিশ্চয় রোদে তাঁর ঘুমের যাতে সমস্যা নাহয় সেই জন্যেই।
চোখ খুলে পাশ ফিরতেই দেখল পুতুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি পড়ছে আর গুনগুন করছে। নীল শাড়ি। হাসনাত নীল শাড়ি পছন্দ করে খুব, ব্যাপারটা পুতুলকে অনেকবার জানানো হয়েছিল। কিন্তু পুতুল শাড়ি পড়তে চাইত না। আজ নিজে নিজেই পড়ছে। শাড়ির কুচি পেটে ঢুকিয়েই লম্বা চুল এলিয়ে দিল কাঁধে, আর তখনি হাসনাতের দিকে চোখ পড়ল। শাড়ি পড়া অবস্থায় হা করে তাকিয়ে আছে দেখে পুতুল লজ্জা পেল। লাজুক মুখে হাসনাতের দিকে আবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-চা খাবা? আনব?
......লিখাঃ সাখাওয়াত সাব্বির
......তারিখঃ ০৮.০৮.২০১৮ ইং

2 মন্তব্যসমূহ
Oshadaron
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
উত্তরমুছুন