শেষ নবী (অধ্যায়ঃ ০৫)



মা আমিনার মৃত্যুর পর উম্মে আয়মান নবী মুহাম্মদকে মক্কায় নিয়ে আসেন। উম্মে আয়মান ছিলেন মুহাম্মদের বাবা আবদুল্লাহ এর একজন ইথিওপিয়ান দাসী। তাঁর মৃত্যুর পর উম্মে আয়মান তার পরিবারের কাছে ছিলেন, নবী মুহাম্মদ একসময় তাকে মুক্ত করে দেন। মক্কায় আসার পর উম্মে আয়মান নবীকে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের কাছে দিলেন।
আবদুল মুত্তালিব মুহাম্মদকে সবসময় সাথেই রাখতেন। তিনি কাবাঘরের ছায়ায় তাঁর জন্য একটি আসন নির্ধারন করে রেখেছিলেন। আবদুল মুত্তালিব ছাড়া কেউই সে আসনে যেতেন না, এমনকি তাঁর ছেলেরাও না। ছেলেরা সেই আসনের আশেপাশে বসতেন। কিন্তু নবী মুহাম্মদ ছিলেন আলাদা। তিনি সরাসরি সেই আসনে গিয়ে বসতেন। একবার তাঁর এক চাচা তাকে সেই আসন থেকে সরিয়ে দিতে চাইলেন এই ভেবে যে ছোট ছেলের এত সম্মানীয় জায়গায় বসা উচিৎ না। কিন্তু, আবদুল মুত্তালিব বললেন,
“তাকে ছেড়ে দাও। তাঁর মধ্যে আমি কিছু বৈশিষ্ঠের আভাস পাচ্ছি। এ সন্তানকে তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দাও”।
আবদুল মুত্তালিব নবী মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে থাকতে আনন্দ বোধ করতেন। একবার এক হাজী মক্কায় গিয়ে দেখলেন আবদুল মুত্তালিব তাওয়াফরত অবস্থায় বলছেন, “হে আল্লাহ, আমার মুহাম্মদকে ফিরিয়ে দিন এবং আমার প্রতি সর্বত্তম অনুগ্রহ করুন”। সেই হাজী লোকজনকে জিজ্ঞেস করল, উনি কে? লোকজন জানাল, তিনি আবদুল মুত্তালিব। নিজের নাতিকে উট খুজতে পাঠিয়েছেন। তাঁর নাতি মুহাম্মদকে যে কাজ দেয়া হয় সেই কাজ সে আদায় করে আসে। কিন্তু, আজ অনেক্ষন আগে গেছে এখনো আসেনি। তাই আবদুল মুত্তালিব এমন করছেন।
এর কিছুক্ষনের মধ্যেই নবী মুহাম্মদ ফিরে আসেন এবং উটটি তাঁর পিছনে ছিল। আবদুল মুত্তালিব নাতিকে দেখা মাত্র জড়িয়ে ধরে বললেন,
“আমি তোমার জন্য খুবই চিন্তিত ছিলাম। এখন থেকে আমি আর কখনোই তোমাকে আলাদা করব না”।
ছয় বছর বয়সে মা হারানো এই মুহাম্মদকে তাঁর দাদা দুই বছর লালন-পালন করেছেন। আট বছর বয়সে কুরাইশ বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর আবদুল মুত্তালিব ইনতেকাল করেন। তাকে জহুন এ দাফন করা হয়। মৃত্যুর আগে আবদুল মুত্তালিব নবী মুহাম্মদের দায়িত্ব আবু তালিবের হাতে উঠিয়ে দেন। আবু তালিব ছিলেন নবীর আপন চাচা। তিনি ওসিয়ত করেন;
“পরিপূর্ণ ভালোবাসা দিয়ে তাঁর অভিভাবকত্ব ও লালন-পালন করবে” ।
আবদুল মুত্তালিবের জানাজা যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আট বছর বয়সী নবী মুহাম্মদ তখন কাঁদতে কাঁদতে পিছু পিছু যাচ্ছিলেন। আবু তালিব তাকে নিজ সন্তানের চেয়েও বেশি আদর করতেন। আবূ তালিব তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আনন্দ নিয়ে সেবা করে গেছেন নবী মুহাম্মদের। দুঃখের বিষয় হল, আবূ তালিব ইসলাম গ্রহনের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলেন।
একবার মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সবাই বৃষ্টির জন্য আবূ তালিবকে দোয়া করতে বলেন। তিনি একদল লোক সহ নবী মুহাম্মদকে নিয়ে কা’বা শরীফ যান এবং দেয়ালে তাঁর পিঠ ঠেকিয়ে দেন। ওই অবস্থায় আকাশে কোন মেঘ ছিল না, তিনি অনুনয়ের সঙ্গে আকাশের দিকে তাকালে আকাশে মেঘ ছুটে আসল এবং এত বৃষ্টি পাত হল যে সমস্ত নালা-খালে পানি প্রবাহিত হল। আবূ তালিব বলেন,
“তাঁর চেহারা এত উজ্জ্বল আর আলোকময় ছিল যে ঐ চেহারার বরকতে আল্লাহর কাছ থেকে বৃষ্টি চাওয়া হয়। যিনি এতিমদের আশ্রয়স্থল এবং বিধবাদের অবলম্বন ও সহায়”।
রাসুলের বয়স বারো বছর। আবূ তালিব কুরাইশ কাফেলার সাথে ব্যবসার উদ্দেশ্য সিরিয়ায় যাবেন ঠিক করলেন । তখনকার এসব লম্বা সফরে অনেক বিপদ আপদ থাকত, তাই আবূ তালিব মুহাম্মদকে রেখে যাবার স্বিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু, মুহাম্মদের চেহারায় দুঃখের চাপ দেখা গেল। যাত্রার শুরুর সময় আবূ তালিব স্বিদ্ধান্ত পাল্টালেন, মুহাম্মদকে সফরে নিয়ে গেলেন।
কাফেলা বসরা শহরে পৌছালো। সেখানে জারজীস নামের এক খ্রীস্টান দরবেশ বাস করতেন । প্রতিবারই যখন আরবের কাফেলা বসরা শহরে তাঁর সামনে দিয়ে যেত, তিনি কখনও তাদের প্রতি লক্ষ করেনি। কিন্তু আবূ তালিবের কাফেলার খবর শুনে তিনি বের হলেন এবং কাফেলার প্রত্যকটি মানুষের দিকে তিনি নজর দিলেন। গভীরভাবে নিরীক্ষণ শেষে তিনি নবী মুহাম্মদের হাত ধরে বললেন,
“তিনিই বিশ্বনেতা, তিনি বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর প্রেরিত রাসুল, যাকে আল্লাহ গোটা বিশ্বের জন্য রহমতস্বরুপ প্রেরণ করেছেন” ।
কুরাইশ নেতারা জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি করে বুঝলেন”? দরবেশ উত্তর দিল, “আপনারা যখন বের নিজেদের অবস্থান থেকে বের হয়েছেন, পথিমধ্যে গাছপালা, তরুলতা ইত্যাদি নতশিরে তাকে সম্মান জানিয়েছে। এসব কিছু শুধু মাত্র নবীদের সম্মানে করে। এছাড়া তাঁর দু বাহুর মাঝখানে আপেল আকৃতির মোহরে নবূওয়াত দেখেও চিনা যায়”।
দরবেশ ছিলেন খুবই জ্ঞ্যানী, তিনি শেষ নবীর আগমন সম্পর্কে আসমানী কিতাবসমূহের বর্ণনা সম্পর্কে বাহীরা নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। জারজীস নবীর উপলক্ষে কাফেলার সবাইকে খাবারের দাওয়াত দিলেন। খাবার খেতে যথাসময়ে সবাই হাজির, কিন্তু নবী মুহাম্মদ ছাড়া। দরবেশ জানতে পারলেন তিনি উট ছড়াতে গিয়েছেন। লোক পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনা হল।
চারণভূমি থেকে আসার সময় এক খন্ড মেঘ তাকে ছায়া দিয়ে আসছিল। তিনি কাফেলার কাছে পৌছে দেখতে পেলেন সবাই গাছের ছায়ার নিচে আশ্রয় নিয়েছে, ছায়াঘেরা আর কোন জায়গা বাকি নেই। নবী মুহাম্মদ (সঃ) এক পাশে বসে পরলেন এবং গাছের ছায়া প্রসারিত হয়ে তাঁর উপর এসে পড়ল । দরবেশ কাফেলার উদ্দেশ্য বলল,
“আপনারা কখনই তাকে রোমের দিকে নিবেন না, তারা তাকে দেখলে তাঁর গুনাবলী আর লক্ষন দেখে চিনে ফেলবে এবং মেরে ফেলবে”।
দরবেশ কুরাইশ কাফেলাকে জিজ্ঞেস করল তোমাদের মধ্য এই বালকের অভিবাবক কে”? সবাই আবূ তালিবের দিকে ইঙ্গিত করলে, দরবেশ আবূ তালিবকে বলল, আপনি তাকে এখনই ফেরত পাঠিয়ে দিন। আবূ তালিব তাকে আবূ বকর ও জৈনেক ব্যক্তির সাথে মক্কায় ফেরত পাঠালেন। বলা হয়ে থাকে সেই জৈনেক ব্যক্তি ছিলেন বিলাল।
নবী মুহাম্মদ যখন ধীরে ধীরে কৈশরের শেষ দিকে, তখন হারবুল ফুজ্জার নামে ভয়ানক এক যুদ্ধ শুরু হয় কুরাইশ গোত্র এবং বনী কায়স গোত্রের মধ্যে। নবী সেই যুদ্ধে অংশগ্রহন করার বয়স হলেও তিনি শুধু মাত্র তাঁর চাচাদের তীর উঠিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছুই করতেন না। কারন এই যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী দুই পক্ষই ছিল আল্লাহর অবাধ্যকারী।
যুদ্ধে অংশগ্রহন না করলেও ততদিনে মুহাম্মদ কুরাইশদের মধ্য সবচেয়ে সাহসী, সবচেয় সত্যবাধী, সবচেয়ে সৎ, সহনশীল ছিলেন এবং সবার খোজ-খবর রাখতেন। তিনি কটু কথা, ঝগড়া-বিবাদ, অশ্লীনতা ও বাজে কথা থেকে সবসময় বিরত থাকতেন বলে অল্প বয়সেই তাঁর সম্প্রদায় তাকে ‘আমীন’ উপাধিতে ভূষিত করে। এরকম এক ঘটান ছিল আবদুল্লাহ ইবনে আবুল হামসার, তিনি বলেছেন,
“আমার সাথে মহানবী (সঃ) এর কোন ব্যপারে দেনা ছিল কিছু। আমি তাকে বললাম আপনি অপেক্ষা করুন, আমি এখনই আসছি। বাসায় গিয়ে আমি ভুলে গেলাম, এবং তিনদিন পর মনে হলে আমি সাথে সাথে সেই জায়গায় গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমাকে দেখে শুধু এতটুকু বললেন যে, ‘তুমি আমাকে খুবই কষ্ট দিয়েছ;
তিনদিন ধরে আমি এখানে অপেক্ষা করছি’”।
Best Blog in Bangladesh

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ