সম্মোহিত অশরীরী

সম্মোহিত অশরীরী

টানা দুই ঘন্টা কখনো হাসপাতালে থাকা হয়নি । আমি হাসপাতালের গন্ধ নিতে পারিনা । সেই আমি টানা দুই দিন হাসপাতালে পড়ে ছিলাম । দেখার কেউই ছিল না । আহারে বেচারা টাইপ অবস্থা ।
এই বেচারা টাইপ অবস্থার কথা জানতে পেরে ভাইয়া তার স্টাফ পাঠালেন আমাকে বাসায় নিয়ে যাবার জন্য । ভাইয়া দুই মাস যাবত বাসায় নেই । ঢাকা শহরে এগারো তালার উপর ইয়া বড় ফ্ল্যট দুই মাস খালি রাখা অন্যায়, শুধু অন্যায় না...
শয়তানের ভাই টাইপ অন্যায়
সেই বাসায় আমাকে নেয়া হবে , দেখাশুনা করবে তার অফিসের স্টাফ । প্রায় দুই বছর যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছুদিন একা সময় কাটাতে পারব, এটা আনন্দের বিষয় । বাসায় বসে টিভি দেখব আর লিখালিখি করব । আমার জন্য আদুরে সময় । আমি সেই আদুরে সময় পাওয়ার লোভে স্টাফের সাথে বাসায় যাবার জন্য অধীর আগ্রহে ছিলাম ।
সেই স্টাফ এল না । ভাইয়াকে কল দেয়া মানে বেচারার চাকরি যাওয়া, আমার কোন ইচ্ছে নেই তার চাকরি নেয়ার । সবচেয়ে বড় কথা আমার জন্য সুখের সংবাদ আমি একদম একা থাকব । কারো সেবা আমার পছন্দ না ।
হাসপাতাল থেকে বের হবার হতেই রাস্তায় ভিড় দেখালাম । কেউ একজন এক্সিডেন্ট করে রাস্তায় পড়ে আছে, মানুষ খুব আগ্রহ নিয়ে থেতলানো লাশ দেখছে । আমার রক্ত দেখলেই মাথা ঘুরায় আর এরা বাসের চাকায় থেতলানো মাথা দেখে কিভাবে বুঝি না । এরা কি সেই রাতে ভাত খেতে পারে ? প্রশ্নটা যৌক্তিক, উত্তরটা জানা দরকার । নোট রইল, হাসপাতালের দাড়োয়ান দাঁড়িয়ে লাশ দেখছে । খেয়াল করে তাকে জিজ্ঞেস করতে হবে সেই রাতে খেয়েছেন কিনা ?
বাসায় ঢুকে দরজা লক করলাম না, ভাইয়ার অফিসের স্টাফ আসতে পারে । গোসল করব সময় নিয়ে, হাসপাতালের গন্ধ যতক্ষন না শরীর থেকে দূর হয় । অনেক্ষন গোসল করার পর শরীরটা ঝরঝরে লাগল । বেডরুমে গিয়েই দেখি স্টাফ দাঁড়িয়ে আছে । অপরাধ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা । আমার মায়া লাগল, বললাম ;
-‘সমস্যা নেই। আমি হাসপাতাল থেকে আসতে কোন সমস্যা হয়নি’।
সে জ্বী স্যার টাইপ চেহারা নিয়ে দাড়িয়েই থাকল । বললাম টিভি অন কর । টিভি দেখ । আমি আধা ঘন্টা ঘুমাব । তুমি এর মধ্যে খাবার নিয়ে এস । ছেলেটা এখনো জ্বী স্যার টাইপ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম । ঘুম আসছে না । শরীর এখনো ভাল হয়নি । অনেক্ষন এপাশ ওপাশ করে মুখ তুলে দেখি ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
- কিছু বলবে তুমি?
-জ্বী
-বল
-স্যার আমার নাম মোহন ।
-আচ্ছা মোহন । সুন্দর নাম । তুমি মোহন শব্দের অর্থ জান?
-জ্বী স্যার জানি । সম্মোহন করা ।
-তুমি মানুষকে সম্মোহন করতে পার ?
-না স্যার । পারিনা ।
পারার কথা না । সম্মোহন করার জন্য শক্ত মানসিকতার মানুষ হতে হয় । ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে না শক্ত মানসিকতার ।
-তোমাকে কেউ কখনো সম্মোহন করতে পেরেছিল ?
-জ্বি স্যার । ছেলেটার চোখ জ্বলজ্বল করছে । বুঝতে পারছি যে তাকে সম্মোহন করেছে তাকে সে তার পছন্দের কেউ ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
-কে?
-আমার সাথে স্কুলে পড়ত স্যার । নাম আনিতা । চেহারা অসাধারন রুপবতী টাইপ কিছুই না । কিন্তু চোখ ছিল ভয়ংকর ।
-ভয়ংকর কেন?
-ওই চোখে তাকালে স্যার আমি সম্মোহন হয়ে যেতাম ।
-আচ্ছা।
-আমি মেয়েটাকে...
বাকি কথা শেষ করতে দিলাম না । বেশি হয়ে যাচ্ছে । এখন তার ভালোবাসার গল্প শুনাবে আমাকে । কোন দরকার নেই । শরীর খুব দূর্বল । ঘুমাতে হবে আমাকে । একটা মাইলাম’ খেয়ে শুয়ে পড়লাম । অল্পতেই ঘুম চলে আসল ।
আমি অনেকদিন স্বপ্ন দেখি না । কাজের ব্যস্ততায় রোবট হয়ে গিয়েছিলাম । রোবটদের স্বপ্ন নেই, আমারো স্বপ্ন নেই । আজ আমি স্বপ্ন দেখলাম । আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়া মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে । বিয়ের শাড়িতে অসম্ভব রুপবতী মেয়েটার চোখে চিকচিক করা হাসি । নতুন করে কোন রাজপুত্রের ঘরে যাবার হাসি । মেয়েটা সবসময় রাজপুত্রের স্বপ্ন দেখত। আমি স্বপ্নে সেই রাজপুত্রকে দেখতে চাইলাম । পারিনি, শুধু রাজপুত্রের কথা শুনতে পারছি,
-‘বিয়ের সময় মেয়েরা লাল শাড়ি পড়ে, তুমি নীল শাড়ি কেন পড়েছ?’
রাজপুত্রের কথা শুনে মেয়েটা হাসছে । চোখে চিকচিক করে হাসির সাথে মুখে আওয়াজ করে হাসি । বিব্রতকর অবস্থা, বিয়ের সাজে কোন মেয়ে এত আওয়াজ করে হাসতে পারেনা । সবাই কি ভাববে ? হাসির আওয়াজ কমানোর জন্য মিউজিক শুরু হল । বিয়ে বাড়িতে গানের আসর ।
আমি মিউজিক শুনতে চাইনি, হাসির শব্দ শুনতে চেয়েছি । মেয়েটার হাসি আমার খুব পছন্দের । মেয়েটা আমার পছন্দ বুঝতে পারেনি । পারেনি বলেই তাকে পাওয়া হয়নি । হাসির শব্দ আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল । মিউজিক খুব জোড়ে বাঝছে ।
আমার ঘুম ভাংতেই দেখি মোবাইলের রিংটোন বাঝছে । রাত দুইটা । ঘুমের ওষুধ কাজ করেছে । আমি তিন ঘন্টা ঘুমিয়ে নিয়েছি । এই ঘুমের ওষুধটা কাজের মনে হচ্ছে । প্রচন্ড খিদে লেগেছে, অবাক ব্যাপার হল ছেলেটা এখনো আগের জায়গায় বসে আছে ।
-সমস্যা কি তোমার ? খাওয়া আন নাই ?
-নাহ ।
-কেন এসেছ তাহলে? এত রাতে কোথায় পাব খাবার ?
ছেলেটা উঠে রুম থেকে বের হয়ে গেল । বজ্জাত ছেলে দেখছি । নিজেও খায়নি, আমাকে কষ্টে রাখবে । টানা রিং হচ্ছে দেখে আমি ফোন ধরলাম, হ্যালো ভাইয়া ।
-তুই খুব অসুস্থ ?
-না ভাইয়া । ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছিলাম । বল
-আমার স্টাফটা হাসপাতালে যেতে পারেনি । তুই রাগ করেছিস ?
-নাহ । আমি ত চলে এসেছি বাসায় । সমস্যা হয়নি ।
-বাসায় চলে এসেছিস ?
-হ্যা।
-স্টাফটা গিয়েছিল । হাসপাতালের সামনে বাস এক্সিডেন্ট করে মাথা থেঁতলে যায় । স্পট ডেথ । ছেলেটার নাম মোহন, আমার এখানে কাজ করে ছয় মাস । খুব ভাল ছেলে । বাড়ি রাজশাহী । ওর ভাই লাশ নিয়ে বাড়ি গেছে । আমি তার বাড়িতে যাচ্ছি । তুই বাসায় থাক, সমস্যা হলে বলিস, অন্য কাউকে যেতে বলব ।
আমি পাশের রুমের দিকে তাকিয়ে আছি । ছেলেটার নাম মোহন । মোহন নামের অর্থ সম্মোহন করা । ছেলেটা আমাকে সম্মোহন করে দিয়েছে । আমি চোখ বা শরীর কিছুই নাড়াতে পারছি না । আচ্ছা ছেলেটা তার সাথে পড়া স্কুলের মেয়েটার কথা কি বলছিল ? সে কি তাকে খুব ভালোবাসে ? ভালোবাসে বলেই তার চোখের দিকে তাকালেই সম্মোহিত হত । আচ্ছা,
আনিতা নামের অর্থ কি ?
Best Blog in Bangladesh

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ