শেষ নবী - অধ্যায়ঃ ০৮

 

মুহাম্মদের বয়স যখন চল্লিশ বছরে পৌছল, একদিন তিনি হেরা গুহায় গেলেন। ঘটনাক্রমে এক ফেরেশতা গুহায় এলেন এবং সালাম দিলেন। এরপর বললেন পড়ুন। নবী মুহাম্মদ বললেন আমি পড়তে জানিনা। ফেরেশতা তাকে কঠিনভাবে জড়িয়ে ধরল যে তাঁর সীমাহীন কষ্ট হচ্ছিল। ছেড়ে দিয়ে আবার বললেন, পড়ুন। তিনি আবার উত্তর দিলেন, আমি পড়তে জানি না।
এখানে পড়তে না জানিনা কথাটা বলার একটা ব্যখ্যা আছে। বলা হয়ে থাকে ওহীর ওজন এবং কাঠিন্য এত প্রচন্ড যে মুহাম্মদের ভয় হচ্ছিল ওহীর আমানত ও প্রচন্ডতা দ্বারা তাঁর নশ্বর দেহ ওহীর ওজন এবং দায়িত্বভার বহন করতে পারবে কিনা।
ওহীর ওজন এতটা হত যে, তিনি যখন উটনীর উপর থাকা অবস্থায় ওহী নাজিল হত তখন উটনী বসে পড়তো। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা) ছিলেন ওহী লিপিবদ্ধকারী সাহাবীদের মধ্যে একজন। একবার মুহাম্মদ (সঃ) এর উপর ওহী নাজিল হবার সময় যায়েদ ইবনে সাবিত (রা) এর পায়ের উপর মুহাম্মদ (সঃ) এর শরীর ছিল। ওহী নাজিল হবার সময় যায়েদ ইবনে সাবিত (রা) এর মনে হল তাঁর পায়ের হাড় ভেঙে চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যাবে।
ফেরেশতা তৃতীয়বারের মতন মুহাম্মদ (সঃ) কে বুকে চেপে ধরলেন এবং ছেড়ে দিয়ে বললেন পড়ুন;
“আপনি আপনা সৃষ্টিকর্তার নামে পড়ুন, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন রক্তপিন্ড দিয়ে, আপনি পড়ুন আপনার প্রভু বড়ই মেহেরবান, যিনি কলম দিয়ে শিখিয়েছেন আর মানুষকে ঐ জ্ঞ্যান শিখিয়েছেন যা সে জানত না”।
এক বর্ণনায় এসেছে, জিবরাঈল (আ) তখন তাকে নবূওয়াতের সুসংবাদ দিলেন এবং রাসুল (সঃ) যখন ঘরে ফিরছিলেন তখন পথিপার্শ্বের সব পাথর ও গাছগাছালি বলতে লাগলো,
“হে আল্লাহর নবী ! আপনার প্রতি সালাম”।
রাসুল (সঃ) ঘরে ফিরে আসেন। তাঁর শরীর থরথর করে কাঁপছিল । এসেই তিনি খাদিজা (রা) কে বললেন, “আমাকে চাদর দাও, আমাকে চাদর দাও”। কিছুক্ষন পর তিনি শান্ত হয়ে পুরো ঘটনা তাঁর স্ত্রীকে খুলে বললেন। খাদিজা (রা) সব শুনে বললেন,
“আপনার কল্যান হোক এবং আপনার জন্য সুসংবাদ। আল্লাহর শপথ ! তিনি আপনার জন্য কল্যানই করবেন। যে সৌভাগ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কাছে এসেছে তা গ্রহন করুন, নিঃসন্দেহে তা সত্য। আবার বলছি এটা আপনার জন্য সুসংবাদ, নিশ্চই আপনি আল্লাহর সত্যিকারের রাসুল”।
এরপর খাদিজা গেলেন তাঁর চাচাত ভাই ওরাকা ইবনে নওফেলের কাছে। তিনি সুরিয়ানী ভাষা থেকে আরবীতে ইঞ্জিল অনুবাদ করেছিলেন এবং মূর্তিপূজায় বিতৃষ্ণ হয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহন করেন। খাদিজা যখন যান তখন ওরাকা খুবই বৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত খাদিজা (রা) পুরো ঘটনা খুলে বললেন। ওরাকা সব শুনে বললেন;
“তুমি যদি সত্য বলে থাক, তবে অবশ্যিই তিনি নামূস”। (নামূস হল ফেরেশতা যিনি ঈসা (আ) এর কাছে আসতেন।
খাদিজা (রা)এবার রাসুল (সঃ) কে নিয়ে আসলেন ভাইয়ের কাছে। ওরাকা তখন রাসুল (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন কি ঘটেছিল। রাসুল (সঃ) পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন । ওরাকা সব কথা শুনার পর তাঁর মনে দৃঢ় মনোভাব হল রাসুল (সঃ) যা বলেছেন সবই সত্য। তিনি বললেন,
“আগন্তুক হল সেই নামূস যিনি মূসা (আ) এর কাছে আসতেন। হায় ! আমি যদি তোমার নবী হবার সময় শক্তিমান থাকতাম এবং অন্ধ না হতাম! যখন তোমার সম্প্রদায় তোমাকে দেশছাড়া করবে, তখন যদি জিবীতও থাকতাম এবং অন্ধ না হতাম !”
রাসুল (সঃ) আশ্চার্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ওরা কি আমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে?” ওরাকা বললেন,
“কেবল তুমিই নও। এ পৃথিবীতে যিনিই আল্লাহর বানী নিয়ে এসেছেন, মানুষ তারই সঙ্গে শত্রুতা করেছে। যদি আমি ঐ পর্যন্ত বেচে থাকি তবে অবশ্যিই তোমাকে সাহায্য করবো”। কিন্তু, ওরাকা বেশিদিন বাচলেন না।
রাসুল (সঃ) ঘরে ফিরে এলেন। এরপর অনেক দিন তাঁর প্রতি ওহী নাযিল বন্ধ রাখা হয় যাতে তাঁর কষ্ট এবং ভীতি দূর হয়। পরবর্তী ওহী আগমনের উৎসব করার আগ্রহ তাঁর অন্তরে জাগ্রত হয়। ওহী বন্ধ হবার পর রাসুল (সঃ) এতটাই চিন্তিত হয়ে গেলেন যে তিনি বারবার পাহাড়ের চুড়ায় উঠতেন এবং সেখান থেকে নিজেকে ফেলে দেয়ার কথা ভাবতেন। যখনি এমন চিন্তা করতেন, তখন জিবরাঈল (আ) দ্রৃশ্যমান হয়ে বলতেন,
“হে মুহাম্মদ ! সত্যিই আপনি আল্লাহর রাসুল”। এ কথা শুনার পর তাঁর মনে স্বস্তি ফিরে আসত।
একবার খাদিজা (রা) তাঁর স্বামীকে বললেন, “এরপর আবার জিবরাঈল (আ) আসলে, পারলে আমাকে খবর দিবেন”। নবী পরেরবার জিবরাঈল (আ) আসার পরপর ওয়াদা মোতাবেক স্ত্রীকে খবর দিলেন। স্ত্রী এসে রাসুল (সঃ)কে অনুরোধ করলেন,
“আপনি আমার আলিজ্ঞনাবদ্ধ হন”। তিনি আলিজ্ঞনাবদ্ধ হলেন ।
এরমধ্যেই খাদীজা (রা) মাথার কাপড় খুলে ফেললেন এবং রাসুল (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, “এখনো কি আপনি ফেরেশতা দেখতে পারছেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “না”। তখন খাদিজা (রা) বললেন,
“আপনি সুসংবাদ গ্রহন করুন। আল্লাহর কসম, তিনি ফেরেশতা, শয়তান নয়। শয়তান হলে আমার ঘোমটা খোলার পর লজ্জাবোধ করতো না”।
খাদিজা (রা) এর চাচাত ভাই ওরাকা রাসুল (সঃ) এর নবূওয়াত ও রিসালাত স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু, প্রকাশ্য ইসলামের দাওয়াত শুরুর আগেই ইনতেকাল করেন। রাসুল (সঃ) একবার ওরাকাকে স্বপ্ন দেখেন এবং বলেন, “তিনি সাদা পোশাকে ছিলেন। যদি দোযখের অধিবাসী হতেন, তাহলে অন্য কোন রঙের পোশাক পরিধান করতেন”।
রাসুল (সঃ) রমযান মাসে হেরা গুহায় ই’তিকাফ করতেন। তাঁর বয়স যখন চল্লিশ বছর ছয় মাস তখন রমযান মাসের কোন এক সোমবারে তিনি নবূওয়াত লাভ করেন। নবূওয়াতের পর তাওহীদ ও রিসালাতের শিক্ষ্যা দেয়ার পর রাসুল (সঃ)এর জন্য প্রথম ফরয শিক্ষা ছিল অজু ও নামায। প্রথমে জিবরাঈল (আ) পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলে একটি ঝড়না সৃষ্টি হয়। এতে জিবরাঈল (আ) প্রথমে অযু করেন এবং দুই রাকাত নামায পড়ান। রাসুল (সঃ) তাকে অনুসরন করেন।
অযূ ও নামায শেষে তিনি ঘরে গেলেন এবং হযরত খাদীজা (রা) কে অযূ ও নামাজ শিক্ষা দেন। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহন করেন তাঁর সহধর্মিনী হযরত খাদিজা (রা) এবং সোমবার তাঁর সাথে একসাথে নামাজ আদায় করেন। এজন্যই প্রথম কিবলার অনুসারী তিনিই ছিলেন। এরপর ইসলাম গ্রহন করেন ওরাকা ইবনে নওফেল ইসলাম গ্রহন করে ধন্য হন এবং এর পরপরই হযরত আলী (রা) যিনি দীর্ঘদিন তারই অভিবাকত্ব ও তত্ত্বাবধানে ছিলেন।
আলী (রা) দশ বছর বয়সী ছিলেন তখন। তিনি দেখলেন রাসুল (সঃ) আর খাদিজা (রা) একসাথে নামায পড়ছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কি করছ?” রাসুল (সঃ) উত্তর দিলেন,
“এটাই আল্লাহ দ্বীন। এ দ্বীন নিয়েই নবীগন পৃথিবীতে আসেন। আমি তোমাকে এই দ্বীনের প্রতি আহ্ববান করছি এবং তাঁর ইবাদত কর। লাত-উযযাকে অস্বীকার করো।
আলী (রা) বলেন, এটা নতুন কথা। আমি আগে এমন কিছু শুনিনি। আমার বাবা আবূ তালিবের কাছে না শুনে এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারব না”।
রাসুল (সঃ) এ বিষয় প্রকাশ হয়ে যাবার ভয়ে বললেন, “আলী, তুমি যদি ইসলাম গ্রহন নাও কর, তবু এ বিষয়ে কাউকে বলিও না”। আলী (রা) চুপ করে ছিলেন। সেদিন রাত পার হল। ভোর হতেই আলী (রা) আসলেন রাসুল (সঃ) এর কাছে। রাসুল (সঃ) বললেন,
“সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ এক, তাঁর কোন শরীক নেই। লাত-উযযাকে অস্বীকার করো, মূর্তিপূজা থেকে ঘৃণা ও অসুন্তুষ্টি প্রকাশ কর”।
আলী (রা) মুহাম্মদ (সঃ) এর নবূওয়াত প্রাপ্তীর পরদিন মঙ্গলবার ইসলাম গ্রহন করেন এবং প্রথম নামায আদায় করেন। তিনি অনেকদিন ইসলাম ধর্ম গ্রহনের কথা তাঁর পিতা আবূ তালিব থেকে গোপন রেখেছিলেন। কিছুদিন পর তাঁর মুক্তপ্রাপ্তগোলাম যায়েদ ইবনে হারিসা (রা) ইসলাম গ্রহন করেন এবং তাঁর সাথে নামায আদায় করেন। এভাবে শুরু ইসলাম গ্রহনের সুন্দর সময়গুলো।
যা আজ অবধি টিকে আছে !!


Best Blog In Bangladesh

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ