আমাদের বিপাশা হায়াত

একজন বিপাশা হায়াত 


বিপাশা হায়াত। বাংলাদেশের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তিনি সেই নক্ষত্র যা কখনো ঝরে পড়েনা। তিনি সেই নক্ষত্র যার আলো কখনো ধুপ করে নিভে যায়না। তিনি সেই নক্ষত্র যিনি তার কাজ এবং ব্যাক্তিত্বের মাধ্যমে মানুষকে বিনোদন দিয়েছেন কয়েক প্রজন্মে । আজকের গল্প সেই নক্ষত্রকে নিয়েই।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা দিবসের তিনদিন আগে ২৩ মার্চ স্বনামধন্য অভিনেতা আবুল হায়াত এবং মাহফুজা খাতুন শিরিন এর ঘরে জন্ম গ্রহন করেন । পারিবারিক জীবনে দুই বোনের বন্ধনে আবদ্ধ এই নক্ষত্রের একমাত্র বোনের নাম নাতাশা হায়াত ।

পরিবারে বাবা এবং বোনসহ তিনজনই অভিনয় জগতে নিজেদের নাম উজ্জ্বল করে রেখেছেন । তিনজনই দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছেন । যা দেশের অন্যান্য মিডিয়া পরিবারে তেমন দেখা যায়না ।

বিপাশা হায়াত ১৯৯৮ সালে ফ্যাকাল্টি অফ ফাইন আর্টস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করেন । এর আগেই তিনি মিডিয়ায় দেশের মানুষের নজর কাড়েন।

তার সিনেমা জীবনের গল্পের শুরু দেশের অন্যতম সেরা গল্পকার হুমায়ূন আহমেদ এর মাধ্যমে। আগুনের পরশমনি সিনেমায় তিনি বিপাশা হায়াতের আত্বপ্রকাশ করান একজন রাত্রি নামে। যে রাত্রি ছিল সদ্য তরুনী একজন, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় আটকা পরেন একটা ঘরে। সাথে ছিল তার পরিবার । ঢাকা শহরে আটকা পড়া সেই মেয়েটির ঘরে আশ্রয় নেয় একজন মুক্তিযোদ্ধা (আসাদুজ্জামান নূর) । সেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন সিনেমার নায়ক। রাত্রী সেই গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার প্রেমে পড়ে এবং গল্প এগিয়ে যায় ।

আগুনের পরশমনীতে সেই কিশোরী তার জীবনের প্রথম সিনেমায় অভিনয় দিয়ে দর্শকদের এতটাই মুগ্ধ করেছিলেন যে, দেশের সবাই তাকে অন্তরে গেঁথে রাখে তখন থেকেই । সেই ভালোবাসা তাকে বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরুস্কার এনে দেয় সেরা অভিনেত্রী হিসাবে । এরপর তিনি অন্যান্য আরো পুরুস্কারের সাথেও মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পান ১৯৯৮, ১৯৯৯ এবং ২০০২ সালে ।

হুমায়ূন আহমদে তার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে নিজের পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা জয়যাত্রা বানিয়েছিলেন এই বিপাশা হায়াতকে নিয়ে । যেখানে তিনি অভিনয় করেছেন একজন মধ্যবয়সী মায়ের চরিত্রে। যেই মা তাঁর সন্তানকে হারিয়ে ফেলে আর্মিদের থেকে পালিয়ে যাবার সময় । সেই জয়যাত্রায়ও বিপাশা হায়াত  নিরাশ করেননি হুমায়ূন আহমেদকে। নিজের অভিনয়ে মুগ্ধ করেছেন সারা দেশের সিনেমাপ্রেমিদের ।

অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত 


এই নক্ষত্র অভিনয় করেই ক্ষান্ত হননি । ১৯৯৭ সালে লিখে বসেন ‘শুধুই তোমাকে জানি’ নামের একটি টিভি নাটক । যা তখনকার সময়ে দেশজুড়ে আলোচনায় ছিল অনেকদিন । এর সাথে তিনি টিভি নাটকে অভিনয় করতেন নিয়মিত । তখনকার সময়ে বিপাশা হায়াত অভিনয় নাটক মানেই দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল । ইন্টারনেটহীন সেই যুগে পত্রিকার বিনোদন পাতায় বিপাশা হায়াতকে নিয়ে লেখা কিংবা তাঁর ছবি ছাপা মানেই হলো বাড়তি কাটতি। বিপাশা হায়াতের ভিউ কার্ডের চাহিদা ছিল তখন প্রচুর ।

আজ এত বছর পরে নব্বই দশকের যুবক, তরুন কিংবা কিশোররা নাটক দেখতে গেলে কল্পনায় খোজ করেন শাড়ি পড়ে শান্ত ভঙ্গিতে অভিনয় করা লম্বা গড়নের একজন অভিনেত্রিকে। আয়ময়, রুপনগর, হারজিত, শুধুই তোমাকে জানি, বৃষ্টি, বেলি, প্রত্যাশা, অন্তরমল, হাসুনি, মুখোশ জীবন, সোনালি দানার চিল, কবিতা সুন্দর না, একজন অপরাধীনি সহ অসংখ্যা বাংলা নাটক উপহার দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সোনালী দর্শকদের এই গুনী অভিনেত্রী ।

গুনী মানুষের গুণ এক জায়গায় থেমে থাকেনা। যে রাঁধতে জানে, সে চুলও বাঁধতে জানে। বিপাশা হায়াত যেমন ভালো ছাত্রী ছিলেন, তেমন ভালো অভিনেত্রীও ছিলেন। এখানেই তাঁর গুণ শেষ হয়ে যায়নি । তিনি ছিলেন একজন ভালো চিত্রকর, যিনি আঁকতে পছন্দ করেন এবং অভিনয় জগত থেকে সরে আসার পরেও এঁকে যাচ্ছেন আজ অবধি ।

আর্টিষ্ট বিপাশা হায়াত 



১৯৯৬ সালে গ্যালারি টোন আয়োজিত মিনিএটার পেইন্টিং এক্সিবিশনে তাঁর আঁকা ছবি জায়গা পায় । ১৯৯৮ সালে তিনি ডিভাইন আর্ট গ্যালারি আয়োজিত প্যান প্যসিফিক সোনারগাঁওতে একটা গ্রুপ এক্সিবিশনে জায়গা করে নেন । তাঁর ছয়বারের মতন একক এক্সিবিশন ‘মাইন্ডস্কেপ’ নামে আয়োজন হয়, যা সর্বশেষ ২০১৭ সালে ইতালির রোমে হয়েছিল । সেখানে তাঁর আঁকা ৫০ টি শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয় ।

পরিবার সহ বিপাশা হায়াত 


গুণের গল্প যার শেষ হয়না সেই নক্ষত্রের গুণ থাকে পারিবারিক জীবনেও । নব্বই দশকের বাংলা নাটকের সেরা জুটি তৌকির-বিপাশা । সেই জনপ্রিয় অভিনেতা তৌকির আহমেদকে বিয়ে করেন বিপাশা হায়াত। ভালোবাসার এই বিয়ে পারিবারিকভাবে আয়োজন করা হয় তখনকার ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জ মিলনাতয়নে ১৯৯৯ সালের ২৩ জুলাই ।

তখনকার সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আলোচিত এই বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে বিপাশা হায়াতের পিতা জনপ্রিয় অভিনেতা আবুল হায়াত সংবাদ মাধ্যমে জানান, “দুই পক্ষের বিয়ে একসাথে আয়োজন করা হয়েছে বলে আমরা চার হাজার মানুষকে দাওয়াত দিই। তবুও এক হাজার মানুষের খাবার অতিরিক্ত করা হয় । কিন্তু সারা বাংলাদেশ থেকে এত মানুষ এই বিয়েতে আসে যে আগত অতিথিরা আসন গ্রহন কিংবা খেতে পারছিলেন না। ধারনা করা হয় প্রায় আট হাজার মানুষ এই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল তৌকির-বিপাশাকে দেখার, খাওয়ার জন্য না। আর এই কারনেই প্রায় দুই হাজার মানুষের খাবার বেঁচে গিয়েছিল সেই সময় ।‘
স্বামী তৌকির আহমেদ সহ বিপাশা হায়াত 

সাধারণত মিডিয়ার এমন বিয়ের কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর বিচ্ছেদের গল্প রসালো হয়ে ছড়ায় সংবাদ মাধ্যমে । কিন্তু বিয়ের প্রায় ২৩ বছর পরেও এই জুটির ব্যাপারে কোন নেগেটিব কথাও ছড়ায়র ঘরে দুই সন্তান । এক মেয়ে এবং এক ছেলে। মেয়ের নাম আরিশা আহমেদ এবং ছেলের নাম আরিব আহমেদ । দুজনেই পরিবার নিয়ে এখন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে । ধারনা করা হয়, বিপাশা হায়াত পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হবার চিন্তা ভাবনা করছেন ।

শুভ কামনা থাকবে সবসময় এই পরিবারের জন্য, থাকবে আমাদের এবং একজন বিপাশা হায়াতের জন্য ।


Best Blog in Bangladesh

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ