শেষ নবী - অধ্যায়ঃ ০৭



আদম (আ) থেকে নবী মুহাম্মদ (সঃ)পর্যন্ত মোট পাঁচবার কা’বাঘর নির্মান করা হয়। প্রথমবার আল্লাহ কা’বাঘর নির্মানের নির্দেশ পাঠান জিবরাঈল (আ) এর মাধ্যমে আদম (আ) এর কাছে। আদম (আ) নির্মান শেষ করলে আদেশ হলো, এ ঘরের তাওয়াফ করো। বলা হলো,

"তুমিই পৃথিবীর প্রথম মানুষ আর এ ঘরই (আল্লাহ’র ইবাদতের উদ্দেশ্যে) প্রথম নির্মিত হল”।
হযরত নূহ (আ) এর সময় মহাপ্লাবন হয়। এরপর কা’বাঘরের নিশানাও ছিল না। ইবরাহীম (আ) –কে দ্বিতীয়বার কা’বাঘরের নির্দেশ দেয়া হয়। জিবরাঈল (আ) অবতরণ করে ভিতের সীমানা চিহ্নিত করে দেন এবং ইবরাহিম (আঃ) তাঁর পূত্র ইসমাঈল (আ) কে নিয়ে কা’বাঘর পুনঃনির্মান শুরু করেন।
মুহাম্মদ (সঃ) এর নবূওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে যখন তার বয়স ছিল পয়ত্রিশ বছর, তখন কুরাইশগণ তৃতীয়বারের মতন কা’বাঘর নির্মাণ করলেন। ইবরাহীম (আঃ) নির্মিত কা’বাঘর ছিল ছাদ বিহীন এবং এর দেয়াল উঁচু ছিল না। কালের আবর্তনে অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল। নিম্নাচ্ছলে হওয়ায় বৃষ্টির পানি ভিতর ঢুকত।
এসব সমস্যা দেখে সব কুরাইশ নেতারা বৈঠক করে স্বিদ্ধান্ত নেন বায়তুল্লাহর কাঠামো বিলুপ্তি করে দিয়ে নতুন করে আবার নির্মান হোক।মহানবীর পিতা আবদুল্লাহ-এর মামা ছিলেন ওহাব ইবনে আমর মাখযূমী । তিনি দাঁড়িয়ে সবাইকে বললেন,
“বায়তুল্লাহর নির্মানে যা কিছুই ব্যয় হবে, তা যেন বৈধভাবে উপার্জিত হয়। যিনা, চুরি, সুদ ইত্যাদির কোন পয়সাই এতে নেয়া যাবেনা; শুধু হালাল অর্থই এ নির্মান কাজে ব্যয় করা যাবে। আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং পবিত্রতা পছন্দ করেন। তোমরাও তাঁর ঘরে পবিত্র অর্থই ব্যয় কর” ।
বায়তুল্লাহ নির্মাণের মতো পবিত্র কাজ থেকে কেউ বঞ্চিত না হয়, এজন্য তিনি কা’বাঘরের নির্মাণ কাজ বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ভাগ করে দেন । তখন একটা বানিজ্য জাহাজ জেদ্দা বন্দরে ধাক্কা লেগে ভেঙে যায়। ওলিদ ইবনে মুগিরা এই খবর শোনামাত্র জেদ্দায় যান এবং কা’বাঘরের ছাদ নির্মানের জন্য এর তক্তাগুলো নিয়ে নেন। ঐ জাহাজেই একজন রোম দেশের মিস্ত্রি ছিল। বাকুম নামের সেই মিস্ত্রিকেও তিনি নিয়ে আসেন। সবকিছু ঠিক হবার পর যখন ইমারত ভাঙার সময় হয় তখন কেউ সাহস করেনা। কিন্তু ওলিদ ইবনে মুগিরা গাইতি হাতে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
“হে আল্লাহ ! উত্তম ছাড়া আমাদের কোনো উদ্দেশ্য নেই। আল্লাহ না করুক আমাদের কোন অসৎ উদ্দেশ্য নেই”।
এই বলে হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর দিক থেকে ভাঙা শুরু করলেন। মক্কাবাসী সিদ্ধান্ত নিল, আজ রাতে যদি ওলিদের উপর কোন আসমানী মসিবত নাযিল হয় তাহলে তারা বায়তুল্লাহকে আগের মতন করে দিবে। যদি মসিবত নাযিল না হয়, তাহলে তারাও ওলিদের সাহায্য করবে। সারারাত কাটল, ভোর হল। ওলিদকে দেখা গেল সুস্থ শরীরে গাইতি হাতে পবিত্র হেরেমে উপস্থিত হন ।
সবাই আশ্বস্ত হল, আল্লাহ তা’আলার এই কাজে সম্মতি আছে। জনগন সাহস পেল এবং মনেপ্রানে কাজ শুরু করল। তারা এ পর্যন্ত খনন করল যে, ইবরাহীম (আ) কর্তৃক প্রদত্ত ভিত্তি বের হয়ে গেল। এক কুরাইশী যখন ঐ ভিত্তির উপর গাইতি চালান তখন ভূমিকম্প শুরু হল। তারা খনন কাজ বন্ধ করে পূর্ববর্তী বন্টন অনুযায়ী প্রত্যেক সম্প্রদায় আলাদাভাবে পাথর জমা করে নির্মান কাজ শুরু করল।
সবকিছু সুন্দরভাবে শেষ হয়। যখন হাজরে আসওয়াদকে তাঁর স্থানে রাখার সময় এলো তখন মতবিরোধ শুরু হল। তরবারি কোষমুক্ত হল। খুন কিংবা হানাহানির সম্ভাবনা বাড়তে থাকল। এভাবে চার পাঁচদিন কাটার পর কোন সিদ্ধান্ত হল না তখন কুরাইশদের মধ্য মুরব্বি এবং গন্যমান্য ব্যক্তিত্ব রায় দিলেন,
"যে ব্যক্তি আগামীকাল ভোরে সর্বপ্রথম মসজিদে হারামের দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে তাকে সিদ্ধান্ত দানকারী বানিয়ে তাঁর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিও"।
সবাই এই রায় মেনে নিল এবং আগামীকাল ভোরে যাবার প্রস্তুতি নিল। ভোরে সবাই পৌছে দেখল মুহাম্মদ প্রথম ব্যক্তি। “এ তো মুহাম্মদ। আমরা সবাই তাঁর সালিশ মানতে সম্মত। তিনি তো আল-আমিন”।
মুহাম্মদ একটা চাদর নিলেন এবং তা হাজরে আসওয়াদের উপর রেখে বললেন, প্রত্যক সম্প্রদায়ের নের্তৃবর্গ এই চাদর ধরুন, যাতে এ সম্মানজনক কাজ থেকে কোনো সম্প্রদায় বাদ না পড়েন। এ ফয়সালা সবাই পছন্দ করল। সবাই মিলেমিশে চাদর উঠালো এবং হাজরে আসওয়াদ রাখার স্থানে পৌছালো, তখন মুহাম্মদ এগিয়ে এলেন এবং তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে রেখে দেন।
চতুর্থবার নির্মান হয় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা) এর খিলাফতকালে, তিনি বায়তুল্লাহকে ভেঙ্গে নতুনভাবে পুনঃনির্মান করেন। পঞ্চমবার নির্মাণ করান হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ।
নবূওয়াত প্রাপ্তির আগে মুহাম্মদ (সঃ) এর বয়স যত বাড়ছে আরবে অন্যায়-অত্যাচার প্রতিনিয়ত বাড়ছিল। কা’বাঘরে ছিল নানান রকম মূর্তি। মুহাম্মদ (সঃ) এই অন্ধকার যুগেও নিজেকে পবিত্র রেখেছিলেন। তিনি কখনো মুর্তি পূজা করেননি বরং সব সময়ই এগুলোকে কুফরী মনে করতেন এমনকি নবূওয়াত প্রাপ্তির আগেও।
জাহিলী যুগে সবাই যখন কা’বা ঘর তাওয়াফ করত তখন সেখানে আসাফ ও নায়েলা নামের দুটি মুর্তিকে স্পর্শ করত। একবার হযরত হারিসা (রা) এবং মুহাম্মদ একসাথে তাওয়াফ করছিলেন। হারিসা (রা) তাওয়াফের সময় ঐ মুর্তিগুলোর কাছে গিয়ে স্পর্শ করল। মুহাম্মদ নিষেধ করলেন। হারিসা মনে মনে ভাবল, “দেখি ত। ছুলে কি হয়”। এ ভেবে দ্বিতীয়বার স্পর্শ করল। এবার নবী খুব কড়াভাবে নিষেধ করেন এবং বলেন,
“আমি কি তোমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করিনি?” হারিসা (রা) এরপর থেকে আর কখনো এই কাজ করেননি।
কোনদিন অন্ধকার যুগের কোন সংস্কৃতি মুহাম্মদকে ছুতে পারেনি। দুইবার মনে খেয়াল জেগেছিল কিন্তু আল্লাহ তা’আলা তা থেকে বাঁচিয়েছেন এবং নিরাপদ রেখেছিলেন। প্রথমবার হল, এক রাতে মুহাম্মদ ছাগল চরানোর সাথীদের বললেন, “আজ রাতে তোমরা আমার ছাগলগুলো দেখে আসবে। আমি মক্কায় গিয়ে কিছু কিসসা- কাহিনী শুনে আসি”।
মক্কায় গিয়ে এক বাড়িতে গান-বাজনার আওয়াজ শুনে তিনি জানতে চাইলেন এখানে কি হচ্ছে? জানা গেল অমুকের বিয়ে হচ্ছে। তিনি বসে ছিলেন এবং তাঁর চোখে ঘুম চলে আসল। আল্লাহ তাঁর কানে মোহর লাগিয়ে দিলেন এবং তিনি ঘুমিয়েই থাকলেন, সকালের রোদ তাকে জাগিয়ে দিল। ঘুম থেকে উঠে তিনি সঙ্গীদের কাছে গেলেন, তারা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল সেখানে কি হয়েছিল? তিনি উত্তর দিলেন;
কিছুই না !!
দ্বিতীয়বার, এক রাতে একই ইচ্ছা জাগল এবং একই ঘটনা ঘটল। এরপর তাঁর অন্তরে আর কখনো এরুপ ইচ্ছা হয়নি।
অন্ধকার যুগে একবার এক কুরাইশ প্রিয় মুহাম্মদের সামনে কিছু খাবার রাখলো। তাঁর সাথে ছিলেন যায়েদ ইবনে আমর এবনে নুফায়েল। নবী খাবার খেতে অস্বীকার করলেন, সাথে সাথে যায়েদও খেলেন না । তারা দেবদেবীর নামে যবেহকৃত জন্তু এবং দেবদেবীর নামে উতসর্গকৃত বস্তু খেতেন না। আল্লাহর নাম নেয়া সকল খাবার খেতেন সেই অন্ধকার যুগেও। যায়েদ কুরাইশদের এভাবে বলতেন,
“বকরীকে আল্লাহ তা’আলাই সৃষ্ঠি করেছেন, তাঁর জন্য ঘাস জন্মিয়েছেন। এরপর কেন তোমরা গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করো?”


Best Blog In Bangladesh  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ