নবী মুহাম্মদ মা হালিমার গ্রামে থাকার সময় বকরী চড়াতেন। একইভাবে যুবক বয়সে চরিয়েছেন বকরী। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) একবার বলেন, “যাহরানে আমি নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর সাথে ছিলাম। আমি সেখানে পিলু ফল ছিড়ছিলাম। তিনি বললেন, কালো কালো দেখে ছিড়ো, এগুলো সুস্বাদু হয়ে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল ! আপনি বকরী চরাতেন ? তিনি বললেন,
“হ্যাঁ, এমন কোনো নবী নেই যিনি ছাগল চরাতেন না”।
এর একটা সুন্দর ব্যখ্যা আছে। প্রত্যেক নবী ছাগল চরাতেন। ছাগল এক জায়গায় নিয়ে গেলে সে আরেক জায়গায় দৌড়ায়, যেখানে সেখানে মুখ দেয়। কিছু একদিকে থাকলে কিছু অন্যদিকে দৌড়ায়। রাখাল থাকতে হয় সতর্ক, নাহলে যে কেউ শিকার করতে পারে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাখাল এই দুশ্চিন্তায় থাকে।
নবীগনের অবস্থা নিজ উম্মতগনের সাথে এমন হয়ে হাকে। তাদের কল্যান ও সাফল্যের চিন্তায় তারা দিনরাত পেরেশান করেন। উম্মতের একাকিত্ব তাকে এদিক সেদিক তাড়িত করে, নবীগন বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুততার সাথে তাদেরকে সতর্কতার সঙ্গে নিজের দিকে আহবান করেন। উম্মতের অনেক কাজের জন্য নবীগনের আঘাত লাগে, কষ্ট হয়। তবুও তারা ধৈর্য ধরে সহ্য করে যান। ছাগল যেমন যেকোন মুহূর্তে নেকড়ে বা অন্য কোন শিকারির শিকার হবার ভয় থাকে, তেমনি উম্মতরাও শয়তানের শিকার হবার ভয় থাকে প্রতি মুহূর্ত ।
কথা হচ্ছিল ‘আমিন’ নামের উপাধি নিয়ে চলে গিয়েছি ছাগলের কাহানীতে । নবী মুহাম্মদের বয়স যখন পঁচিশ বছর তখন ঘরে ঘরে তাঁর দায়িত্ববোধ এবং আমানতদারীর সুনামের জন্য মক্কার সবাই তাকে আমিন’ নামেই ডাকত। নবী মুহাম্মদের আমিন’ উপাদি যখন ছড়িয়ে পরেছিল চারদিকে, তখন এক ব্যবসায়ী তাকে চাকরি দেন। আরবের সম্ভ্রান্ত বংশীয় ধনী এই ব্যবসায়ী কুরাইশ বংশের যে বানিজ্যিক কাফেলা হত সেখানে অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে এই ব্যবসায়ী শরীক থাকতেন। পুরো কাফেলার পণ্য সামগ্রী এই ব্যবসায়ীর পণ্যের অর্ধেক হত।
তিনি নবী মুহাম্মদকে প্রস্তাব দিলেন তাঁর পণ্যসামগ্রী নিয়ে সিরিয়ে গেলে অন্যদের মতন তাকেও পারিশ্রমিক ও সম্মানী দেয়া হবে। তখন নবীর চাচা আবূ তালিবের আর্থিক সংকট চলছিল, তাই এই প্রস্তাব গ্রহন করেন । সেই ব্যবসায়ির একজন গোলাম ছিলেন মায়সারা নামের। মায়সারাকে নিয়ে তিনি রওনা হলেন সিরিয়ায়। বসরা পৌছে তিনি একটি ছায়াদার গাছের নিচে বসেন। সেখানে ‘নাস্তুরা’ নামে এক দরবেশ বাস করতেন। নাস্তুরা অবাক হয়ে মায়সারাকে জিজ্ঞেস করল;
“তাঁর দুই চোখে ঐ রক্তিম আভা দেখতে পাচ্ছি”। মায়সারা উত্তর দিল;“এ রক্তিম আভা তাঁর চোখ থেকে কখনো পৃথক হয় না”। তখন দরবেশ বললেন, “তিনিই নবী, ইনিই নবী, ইনিই শেষ নবী”।
কাফেলার ব্যবসা শুরু হল। মায়সারা নবীর সাথে সাথে আছেন। মায়সারা দেখল, দুপুর হলে যখন গরম পড়ে, তখন দুইজন ফেরেস্তা তাঁর মাথার উপর ছায়া বিস্তার করে রাখত। যখন সিরিয়া থেকে রওনা দেন তখন সময় ছিল দুপুর আর দুইজন ফেরেস্তা নবীর মাথার উপর ছায়া দিয়ে যাচ্ছে। তখন নবীকে নিজ ব্যবসার দায়িত্ব দেয়া সেই সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী বালাখানা থেকে এটা লক্ষ্য করলেন এবং সাথে নারীদের দেখালেন।
নবী মুহাম্মদের বরকতে এবারের সফরে ব্যবসায় এত লাভ হয় এর আগে কোন সময় এমন হয়নি। সেই ব্যবসায়ী তাকে যে পরিমাণ পারিশ্রমিক দেয়ার কথা তাঁর চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে দিয়ে দেন। এই ব্যবসায়ী হলেন,
হযরত খাদিজা (রা) ।
খাদিজা (রা) এর বাবার নাম ছিল খুওয়াইলিদ এবং মায়ের নাম ফাতিমা বিনতে যায়িদাহ। তিনি কুরাইশ বংশের ছিলেন। খাদিজা (রা) তাঁর চাচাত ভাইয়ের কাছে সব খুলে বললেন। সফরে দরবেশের বক্তব্য, ফিরিশতাগন কর্তৃক মাথায় ছায়াদানের ঘটনা সব।
তাঁর চাচাত ভাই ছিলেন ওরাকা ইবনে নওফেল, যিনি ছিলেন ঈসায়ী ধর্মের আলেম এবং হিব্রু ভাষার পণ্ডিত । ওরাকা সব শুনে বললেন,
“খাদিজা, এসব যদি সত্য হয় তবে অবশ্যিই মুহাম্মদ এ উম্মতের নবী। এ উম্মতের একজন নবীর আগমন আসন্ন। আমরা যার অপেক্ষা করছি তাঁর সময় খুব কাছাকাছি”।
খাদিজা অন্ধকার যুগের চাল-চলন ও অনৈতিকতা থেকে পবিত্র ছিলেন, এ জন্য নবী মুহাম্মদের আবির্ভাবের আগেও তিনি পবিত্তা (তাহিরা) নামে খ্যাত ছিলেন। আবূ হালা ইবনে যুরারাহ তামীমির সঙ্গে তাঁর প্রথম বিবাহ হয়েছিল। তাঁদের দুজন পুত্র সন্তান ছিল হিন্দ এবং হালা নামের। পরবর্তীতে এই দুজন পুত্রই ইসলাম গ্রহন করেন এবং উভয়ই সাহাবী ছিলেন।
আবূ হালার ইন্তেকালের পর তিনি আতিক ইবনে আয়েয মাখযূমীর সঙ্গে বিয়ে করেন। তাঁদের পুত্র সন্তান ছিল হিন্দ। হিন্দ ইসলাম গ্রহন করেন এবং সাহাবী ছিলেন। কিছুদিন পর আতিকও ইনতেকাল করলে তিনি বিধবা হয়ে যান।
অত্যান্ত জ্ঞ্যানি, বুদ্ধিমতি, উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন এবং ধর্ণ্যার্ঢ এই মহিলাকে বিয়ে করার জন্য কুরাইশ গোত্রের সমস্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সিরিয়া সফরের পর খাদিজা নবী মুহাম্মদকে বিবাহের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। খাদিজা নাফিসা বিনতে মুনিবাকে পাঠান মুহাম্মদের মনোভাব জানার জন্য। নাফিসা মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনি বিবাহ থেকে বিরত রয়েছেন কেন?”নবী উত্তর দিলেন, “আমার হাতে অর্থ-সম্পদ কিছুই নেই”।নাফিসা জানাল, “যদি ধন-সম্পদ, সৌন্দর্য্য ইত্যাদি সম্পর্কেআপনাকে আশ্বস্ত করা হয় , আপনার কি আপত্তি থাকবে”?নবী জানতে চাইলেন, “তিনি কে”?নাফিসা বললেন, “খাদিজা” ।
এই ঘটনা সিরিয়া থেকে আসার দুই মাস পঁচিশ দিন পর । নবী মুহাম্মদ তাঁর চাচা আবূ তালিবের সাথে পরামর্শ করে প্রস্তাব গ্রহন করেন এবং চাচা আবূ তালিব, হামযা এবং কুরাইশ বংশের অন্যান্য মুরুব্বিদের নিয়ে খাদিজার ঘরে যান । বিয়ের সময় খাদিজার চাচা আমর ইবনে আসাদও ছিলেন। বিয়ের খুতবা দেন আবূ তালিব। যার অংশ ছিল এমন;
“এরপর, মুহাম্মদ তো এমন এক ব্যক্তিত্ব, কুরাইশদের মাঝে যে যুবক সম্ভ্রান্ত, উচ্চ মর্যাদা, গুনপনা ও জ্ঞ্যানে সেরা, তাঁর সঙ্গে তাকে তুলনা করা হলে তাঁর পাল্লা বেশী ভারী হবে। সম্পদ যদিও তাঁর কম কিন্তু ধন-সম্পদ তো এক অস্তাচলমান ছায়ামাত্র এবং এমন জিনিষ, যা ফিরিয়ে দেয়া যায়। তিনি খাদিজা বিনতে খুয়ায়লিদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে ইচ্ছুক এবং খাদিজাও তাঁর সঙ্গে বিবাহে আগ্রহী” ।
বিয়ের সময় মুহাম্মদের বয়স ছিল পঁচিশ বছর। খাদিজা ছিলেন চল্লিশ বছর বয়সী। দেনমোহর ধরা হয় বিশটি উট, কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় পাঁচশত দিরহাম। এরমধ্যে দিয়েই আমাদের প্রিয় নবীর বিবাহিত জীবনের শুভ সূচনা হয়।

0 মন্তব্যসমূহ