শেষ নবী (অধ্যায়ঃ ০৩)



৫৭০ সালের এপ্রিল মাস। এক সবহে সাদিকে আবূ তালিবের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এক শিশু। সেই শিশু জন্মের সময় তাঁর মা আমিনার কক্ষে ছিল হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রা) এর মা ফাতিমা বিনতে আবদুল্লাহ ছিলেন। তিনি বলেন,
“সেই শিশু জন্মের সময় ঘর উজ্জ্বল আলোতে ভরে গেছে, আসমানের তারকারাজি নিচের দিকে ঝুকে পড়ছে। এমনকি আমার মনে হচ্ছে, নাজানি এসব আমার উপর এসে পড়ে”।
ব্যবসা উপলক্ষে মক্কায় এক ইহুদী অবস্থান করত। কুরাইশদের এক সভায় এসে সে জানতে চাইল এ রাতে কোন ছেলে সন্তান জন্মগ্রহন করেছে ? কুরাইশরা উত্তর দিল আমরা জানিনা। ইহুদী বলল, তোমরা খবর নিয়ে দেখ, আজ উম্মতের নবী জন্ম গ্রহন করেছেন, তাঁর দুই বাহুর মাঝখানে এক চিহ্ন আছে (মোহরে নবূওয়াত) । তিনি দুই রাত পর্যন্ত দুধ পান করবেন না এ জন্য যে, জনৈক জিন্নগ্রস্ত লোক তাঁর মুখে আঙ্গুলী প্রবেশ করিয়েছিল।
কুরাইশরা সভা ভেঙে খোজ নিতে শুরু করল। জানা গেল আবদুল্লাহ –এর একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহন করেছে। ইহুদী বলল আমাকে এই শিশু দেখাও। ইহুদী গেল, সেই বাচ্চার দু বাহুর মাঝখানে মোহরে নবূওয়াতের চিহু দেখল এবং জ্ঞ্যান হারিয়ে ফেললো ।
এই শিশুটি পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যশালী, মহামানব আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) । উনার দাদা আবদুল মুত্তালিব জানলেন তিনি খতনাকৃত এবং নাড়ী কাটা অবস্থায় জন্মগ্রহন করেন । আবদুল মুত্তালিব ঘোষনা দিলেন, এ সন্তান বড়ই সৌভাগ্যশালী হবে। আর হয়েছিলও তাই ।
জন্মের সাতদিনের মাথায় দাদা আবদুল মুত্তালিব রাসুল (সঃ) এর আকীকা করেন। কুরাইশ বংশের সবাই দাওয়াত পান এবং তাঁর জন্য মুহাম্মদ নামটি নির্বাচন করেন। কুরাইশ বংশে পূর্বে এই নাম কারও ছিল না। তাঁর নাম রাখার পিছনে দুইটি স্বপ্নের ঘটনা জড়িত।
প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন তার দাদা আবদুল মুত্তালিব । তাঁর পিঠ থেকে একটি শিকল বের হয়েছে যার এক মাথা আসমানে আরেক মাথা যমীনে। এক মাথা পূর্ব প্রান্তে আরেক মাথা পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই শিকলটি একটি গাছে পরিনত হয়, যার প্রতিটি পাতা সূর্যের আলোর চেয়ে সত্তর গুন বেশি আলোকোদ্ভাসিত ছিল । পূর্ব ও পশ্চিমের জনগন ওই গাছের ডালের সাথে জড়ানো, কুরাইশের কিছু লোক ডাল আকড়ে ধরে আছে; কুরাইশের আর কিছু লোক গাছটি কাটার ইচ্ছা করেছিল । যখনি তারা গাছ কাটার উদ্দেশ্য এগিয়ে আসছে তখন খুবই সুন্দর সুঠাম এক যুবক এসে তাদের সরিয়ে দিচ্ছিলেন।
ব্যাখ্যা, আবদুল মুত্তালিবের বংশে এমন এক ব্যক্তি জন্মগ্রহন করবেন, পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত সমস্ত মানুষ তাঁর অনুসরন করবে এবং আসমান ও যমীনের অধিবাসীরা তাঁর প্রশংসা প্রকাশ করবে। এই কারনে আবদুল মুত্তালিব তাঁর নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখেন।
দ্বিতীয় স্বপ্নে নবীর আম্মাজানকে বলা হয়েছিল, ‘তুমি সৃষ্টির সেরা, উত্তম চরিত্রের অধিকারী জাতির নেতাকে গর্ভে ধারন করেছ, তাঁর নাম রাখবে ‘মুহাম্মদ’। মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, ‘আমি মুহাম্মদ, আমি আহমদ, আমি মাহী অর্থাৎ কুফর দূরকারী, আমি হাশির, কিয়ামতে লোকদের হাশর আমার দুপায়ের উপর হবে অর্থাৎ সর্বপ্রথম আমিই কবর থেকে উঠব এবং আমি আকিব অর্থাৎ সকল নবীর শেষে আগমনকারী”।
তাঁর জন্মের তিন চার দিন পর তাঁর মা তাকে দুধ পান করান। তাঁর চাচার এক দাসী ছিলেন সুয়াইবা। সুয়াইবা নবীর জন্মের সংবাদ আবূ লাহাবকে বলেন এবং আবূ লাহাব খুশি হয়ে তাকে মুক্ত করে দেন। এরপর থেকে সুয়াইবা দুধ পান করান।
আরবে তখন প্রচলিত একটা নিয়ম ছিল। শিশু যেন জন্মের পর নির্মল আলো-বাতাসে বেড়ে উঠতে পারে শিশুর ভাষা যেন শুদ্ধ হয় এবং খাঁটি আরবীয় স্বভাব থেকে যেন বিচ্যুত না হয় এই জন্য তাদের গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হত। এ প্রথা অনুসারে বনী সা’দের নারীরা দুগ্ধপোষ্য শিশুর সন্ধানে প্রতি বছর মক্কায় আসতো।
সাদিয়া নামের এক নারী তাঁর স্বামী, দুধের শিশু এবং উটনী নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা ছিলেন খুব ক্ষুদার্ত কিন্তু উটনী থেকে এক ফোটা দুধ না আসায় খাওয়া হত না। তাঁর দুধের শিশুও দুর্বল মা থেকে খাবার না পেয়ে সারারাত কান্না করত। এদিকে নবী মুহাম্মদ (সঃ) কে কোন নারী গ্রহন করত না, কারন তিনি ছিলেন এতিম, এতিমকে লালন করে কিইবা পাওয়া যাবে। অন্যদিকে সাদিয়া নামের নারীও কোন শিশু পেলেন না।
তখন তিনি তাঁর স্বামীকে বললেন, “আল্লাহর কসম। আমি অবশ্যিই ওই এতিম বাচ্চাটির কাছে যাব এবং তাকে নিয়ে আসব” । তাঁর স্বামী উত্তর দিল; “ তুমি যদি এমন কর আমার ক্ষতি নেই। আশা করা যায় আল্লাহ তাকেই আমাদের জন্য কল্যান ও বরকতের নিমিত্তে পরিণত করবেন” ।
সাদিয়া বরকতের পূর্ণ প্রত্যাশা নিয়ে এতিম শিশু মুহাম্মদকে নিয়ে আসেন। আল্লাহ তাঁর বরকতের দরজা খুলে দিলেন। এই সাদিয়া হলেন মুহাম্মদ (সঃ) এর দুধমাতা যার পুরো নাম হালিমা সাদিয়া ছিল এবং সবাই হালিমা (রাঃ) বলেই ছিনেন।
তিনি যখন শিশু মুহাম্মদকে কোলে নিলেন তখন তাঁর ঘর বরকতময় হয়ে উঠল, সেরাতে শিশু মুহাম্মদ এবং তাঁর দুধভাই তৃপ্ত হয়ে ঘুমালেন। উটনি থেকে পর্যাপ্ত দুধ খেয়ে হালিমা (রাঃ) এবং তাঁর স্বামীও ক্ষুধা নিবারণ করলেন। সকাল হলে তাঁর স্বামী বলল;
“হালিমা, বুঝে নাও। আল্লাহর কসম, তুমি এক মুবারক সন্তান গ্রহন করেছ” ।
Best Blog in Bangladesh

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ