টুকটাক

  • -পরিবার ছাড়া অন্য কাউকে এতটা গুরুত্ব দিবেন না, যেই গুরত্বের কারনে আপনি সস্তা হয়ে যান। পরিবারে আপনার চার হাত-পা না থাকলেও গুরুত্ব কমবেনা বরং দুর্বল হিসেবে যত্নটা বাড়বে। বাজারে আপনার চার হাত-পা না থাকলে মন থেকে ‘ভালো আছেন?’ কথাটাও কেউ জিজ্ঞেস করবে না। একদম সস্তা হয়ে যাবেন।
  • -প্রতিদিন পরিবারের সাথে একবেলা খাবার একসাথে খাওয়ার চেষ্টা করবেন। এই ব্যাপারটা যে কতটা উপকারী তাঁর ফল একমাসেই পাবেন।
  • -মানুষকে সম্মান দিতে হবে। এটা বাধ্যগত। আপনার অফিসের পিওন হোক কিংবা বাড়ির দাড়োয়ান হোক। অনেক ছোটখাট বিপদে এরাই এগিয়ে আসবে সবার আগে।
  • -আবেগ ব্যাপারটা ভয়ংকর। পৃথিবীতে মানুষ সবচেয়ে বেশী ধোঁকা খায় আবেগে পড়ে। তাই আবেগে একদম গলে যাবেন না।
  • -শিক্ষক-শিক্ষিকার দোয়া মারাত্তক কার্যকরী। পরিবারের বাইরে উনারাই একমাত্র মানুষ যারা সবসময় চায় আপনি অনেক বড় হোন। উনারা তখন ছাত্র হিসেবে আপনার পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন।
  • -নিজের কর্মব্যস্ততাকে পরিবারের চেয়ে বেশী কখনোই ভাববেন না। সপ্তাহে একশত আটষট্রি ঘন্টার মধ্যে আপনি সত্তর ঘন্টা কাজে থাকেন। পঞ্চাশ ঘন্টা কাটে ঘুমে। পনেরো ঘন্টা নিজের জন্যে রাখেন আর বিশ ঘন্টা যায় পারিপাশ্বিক কাজে। বাকি তেরো ঘন্টা সব ফেলে পরিবারকে দিন, মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন।
  • -প্রতিদিন অন্তত মানুষের কিংবা যে কোন প্রানীর একটা উপকার করার চেষ্টা করবেন। এই ব্যাপারটা সারাদিন মন ভাল রাখার জন্যে যথেষ্ট।
  • -নিজের যোগ্যতার উপরে সবসময় বিশ্বাস রাখবেন। আপনার যোগ্যতা সামান্য হলেও সেই সামান্য যোগ্যতাকে ঘষামাঝা করুন, ধারালো হবে। ধারালো জিনিষ অনেক বড় কিছু কেটে দুই ভাগ করতে পারে।
  • -বন্ধুত্ব সবসময় ঠিক রাখুন। স্কুলের পর নতুন বন্ধু কলেজে। এরপর নতুন করে বন্ধু হয় ইউনিভার্সিটিতে। একসময় কর্মক্ষেত্রে এসে সবাই আলাদা হয়ে যায়। যে মানুষটা স্কুল থেকে কলেজ আর ইউনিভার্সিটির বন্ধুত্বও ধরে রাখতে পারে, সেই মানুষটার কখনো কঠিন বিপদ হয়না। হলেও সব সহজ মনে হয়।
  • -ধোঁকা দিবেন না। যদি এই স্বভাব আপনার মধ্যে থাকে পরিহার করুন। ধোঁকা দিয়ে কখনো বড় কিছু হওয়া যায় না। ভুল করে যদি বড় কিছু হয়েও যান, আপনার মৃত্যুর সময়েও মনে শান্তি পাবেন না।
  • -যত পারেন টাকা কিংবা সম্পদ ধার দেয়া-নেয়া থেকে বিরত থাকুন। পৃথিবীতে সেই মানুষটার শুভাকাঙ্ক্ষী বেশী যার কোন লেনদেন নেই।
  • -হারাম খাবেন না। আমার আব্বু সবসময় বলেন, ‘দরকার হলে শাক-সবজি দিয়ে ভাত খাবি তবুও হারাম টাকায় মুরগীর হাড্ডি চাবাবি না’। হালাল মানসিক প্রশান্তি দেয়, যা কিনতে পাওয়া যায় না।
  • -যতটা পারেন আত্বীয়-স্বজন কিংবা বন্ধু-বান্ধবের বিপদে এগিয়ে যান। শুধু অর্থ দিয়েই সাহায্য করা যায় কথাটা ভুল। অনেক সময় পাশে থাকাটাও অর্থের চেয়েও বড় সাহায্য হয় মানুষের জন্য।
  • -হিংসা পরিহার করুন। হিংসা শান্তি নষ্ট করে। আপনার সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। ভাল চাকরি কিংবা ব্যবসা করেন, বাড়ি আছে এবং তিনবেলা ভাল খাবার খান। শরীর সুস্থ পরিবারের সবার। তবুও আপনি অশান্তিতে থাকবেন যদি মনে চিন্তা আসে পাশের বাসার ছেলেটা গার্মেন্টস এর ব্যাবসা দিয়ে দিল কিংবা কোন বন্ধু একটা পরী বিয়ে করে ঘরে আনল; ‘আমি কেন পারলাম না’ ।
  • -নামাজ পড়ুন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সবসময় শরীর এবং মন ঠিকঠাক রাখে। নিজের মধ্যে খামখেয়ালী ভাবটা দূর হয়ে যায়।
  • -যতটুকু পারেন ধর্ম নিয়ে চর্চা করেন, যে কোন ধর্ম আপনাকে খারাপ কিছুই দিবেনা। প্রতিদিন নতুন করে ভাল কিছু শিখবেন ।
  • -যেই মানুষটা আপনাকে গুরুত্ব দেয় তাকে গুরুত্ব দিন। নাহলে একদিন আফসোস করবেন এই ভেবে যে, ‘এই মানুষটার মত করে কেউ আমাকে গুরত্ব দিচ্ছেনা।‘ এই দিচ্ছেনা ব্যাপারটাও এক ধরনের অশান্তি। এই অশান্তিটা সারাজীবনের।
  • -হুটহাট করে কাউকে সন্দেহ করে বসবেন না। আপনার কানে দশজনে একজনের ব্যাপারে বাঝে কথা বলতেই পারে। ততক্ষন বিশ্বাস করবেন না, যতক্ষন না নিজে পরখ করে দেখছেন ।

সাধারণ মানুষের গড় বয়স হিসেবে যতদিন বেচে থাকে সেই হিসেবে আমি অর্ধেক জীবন পার করে দিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে আমি অনেক ভাগ্যবান বলেই এতটুকু বেঁচে আছি। কত শিশু বোমার আঘাতে মরছে, কত কিশোর কঠিন রোগে মরছে, কত তরুণ রোড এক্সিডেন্টে মরছে, কত যুবক বিষ খেয়ে জীবন শেষ করছে। এই তুলনায় আমি সুস্থ স্বাভাবিক অর্ধেক জীবন পার করে দিয়েছি।

উপরে যা বললাম এগুলো আমার জীবনের শিক্ষা। আমি সাধারণ একজন চাকুরীজীবী। এই শিক্ষাগুলো হয়ত ঠিকভাবে বলতে পারিনি কিংবা বুঝাতে পারিনি। কিন্তু উপরে বলা প্রত্যকটা কথা আমার জীবন থেকে শিক্ষা নেয়া।

একটা গল্প বলে শেষ করি।

আমি কলেজ লাইফে অনেক বড় একটা ঝামেলা বাধিয়ে ফেলি। ঝামেলাটা একটু বড় ছিল। ভয়ে আব্বুর সামনাসামনি হতাম না। পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় মোটামোটি। পরিবারের সাথে দুরুত্ব সৃষ্টি হয়। আমি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়ি।

একদিন সকালে হুট করে আব্বু ইস্ত্রি করা সাদা শার্ট আর নেবি ব্লু প্যান্ট নিয়ে এসে বললেন কলেজে চল। আমি হতবম্ব হয়ে রেডি হলাম। আব্বু আমাকে বাইকে উঠিয়ে গেলেন জালালিয়া হোটেলে। ফেনীতে এই হোটেলটা গ্রেনেড সাইজের সিজ্ঞারার জন্য বিখ্যাত ছিল। আব্বু আর আমি সকাল সকাল সিজ্ঞারা খাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করলাম। খেতে খেতে একসময় আমি সব ভুলে গেলাম।

সেদিন আমি কলেজে যাইনি। বাইকে করে বাপ-বেটা শহর ঘুরেছিলাম। সেদিন রাত থেকে প্রতি রাতে একসাথে খাওয়া হত। আব্বু খেতে খেতে যে গল্প গুলো বলতেন সে গল্পগুলো ছিল পজেটিব। আমার জীবনটা পাল্টে গেল ধীরে ধীরে। আমি আজও ছুটিতে বাড়ি গেলে একটা কাজ নিয়মিত করি, আব্বুর সাথে রাতের খাওয়া । আপনারা যারা হাজার টাকা টিকেট করে বক্তৃতা শুনতে যান সেমিনারে। বড় বড় মানুষ কথা বলেন, আপনারা মন দিয়ে শুনেন আর টুকটাক নোট করেন, তাঁদের জন্যে লিখার শেষে আরেকটা তথ্য দিয়ে রাখি;

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় মোটিভেশনাল বক্তা হচ্ছেন বাবা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ