অতৃপ্ত আত্বা



অনেকদিন ধরেই গল্পের বই পড়া হয়না।প্রায় সাত বছর। ইউনিভারসিটি জীবনে আসার পর এই জিনিসটার মায়া হারায় ধীরে ধীরে। তবুও প্রায় সময় পেলেই পড়া হত, কিন্তু হুমায়ূন স্যার মারা যাবার পর আর কখনওই গল্প নিয়ে রাত জাগা হয়নি।
কিছুদিন আগে জীবনের ব্যস্ততায় এক শহর ছেড়ে আরেক শহরে আসা। নতুন বাসায় ঢুকেই মাকরসার জাল আর ময়লার স্তুপ ছাড়া ছোট একটা ব্যাগ পেয়েছিলাম। মেয়েদের ব্যাগ।চেইন নষ্ট সামনের কাপড় ছিড়ে বিশ্রী অবস্থা। বুঝা যাচ্ছে অনেকদিন ধরেই পড়ে আছে বদ্ধ রুমে। সব কিছু ছাড়িয়ে মন ভাল করে দেয়া খবর ছিল ব্যাগে ছয়টা গল্পের বই। স্যার আর্থার কোনাল ডায়েলের ভ্রমণ কাহানী, একিই লেখকের শারলক হোমসের রহস্য গুচ্ছ। রাজীব মীর এর কবিতার বই দুইটি। হুমায়ূন স্যারের আঙুল কাটা জগলু।বাকিগুলো ক্লাস নাইনের পাঠ্যবই। পৌরনীতি এবং ভূগোল। বুঝাই যাচ্ছে কোন কিশোরীর বাসা চেঞ্জ করার সময় ভুল করে হারানো বই এগুলো।
হুলুস্থুল আয়োজন নিয়ে ঘর গুছিয়ে নিলাম।আজ রাতেই সব গল্প গিলতে হবে, পুরানা নেশা জেগে উঠেছে। আলু ভরতা ডিম মামলেট দিয়ে ক্লান্ত শরীরে দুই প্লেট গরম ভাত পাঠিয়ে বিছানায় বসলাম। এক ফ্লাস্ক চা সাথে মিষ্টি জদ্দা দিয়ে পান। পরিপাটি বিছানা।
পৃথীবিতে আপাতত সবচেয়ে সুখি মানুষ আমি।
রাত একটা গল্পের বই পড়ার উত্তম সময়।চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে থাকে। এই সময়টাই জেগে থাকা নতুন স্বামী স্ত্রী ও নিঃশব্দে কথা বলে। চোখে চোখ রেখে কথা।
নিস্তব্ধ কথনের মতন
বলছিলাম গল্প পড়ার আয়োজনের কথা, চলে গেছি মধ্য রাতে দম্পত্তির গল্পে। বিয়ের বয়স হলে এই সমস্যা। রাত একটায় তুমুল বৃষ্টিতে মনে পড়ল পৌরনীতি বইয়ের কথা। শুনেছি এই দেশে রাষ্ট্রের ইতিহাস পাল্টায় পাচ বছর পরপর। খুব দেখার ইচ্ছে আমাদের সময়ের ইতিহাস এখনো আছে নাকি সেটাও ইতিহাস হয়ে গেছে। বইয়ের মলাটের ঘ্রান নিয়ে পড়া শুরু করা আমার পুরানো অভ্যাস। ঘ্রাণ নিতেই মনে হল পোড়া গন্ধ। বেচারি বোধহয় রাঁধতে রাঁধতে পড়ালিখা চালাত।
পরবর্তী দুই ঘন্টা আমি বইয়ে ডুবে গেলাম। রাত তিনটা বিশে যখন শেষ পৃষ্ঠা থেকে চোখ সরালাম তখন আমার চোখে পানি। পৌরনীতি বইয়ে এক কিশোরীর জীবনের গল্প, যেই গল্পের শেষ হয় বদ্ধ রুমে কেরোসিন ঢেলে গায়ে আগুন লাগানোর পর। এরমাঝে কিশোরীর চঞ্চল জীবন থেকে কঠিন বাস্তবতায় জীবন হারানোর গল্প।কিছু একটা মনে হতেই পাশ থেকে বাকি বইগুলো নিয়ে দেখি সব গল্প একিই। মলাট আলাদা। সব পৃষ্ঠাই আশ্চর্য পোড়া ঘ্রাণ। অদ্ভুত এই কাজ যেই করেছে সে হয়ত গল্পটা লুকাতে চেয়েছিল।
দীর্ঘ নিঃশাষ ফেলে বিছানা থেকে নামতেই চোখে পড়ল টকটকে লাল জামা পড়ে দরজায় দাঁড়ানো এক মায়াবী কিশোরীর দিকে।কিশোরীর মাথায় লম্বা করে ঝুটি করা, কপালে লাল টিপ। ঠোটের খয়েরী লিপিস্টিকটা আবার গালের দিকে ছড়ানো। কিশোরীর সবিই ঠিক ছিল শুধু বেমানান ছিল, হাতের কেরোসিনের বোতল আর ম্যাচ বক্সটি। ঠিক পৌরনীতি বইয়ের কিশোরীর মতন। ছয় মাস আগের ঘটনা;
কিশোরী এই রুমেই নিজেকে পুড়িয়েছিল
Best Blog in Bangladesh

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ