শেষ নবী (অধ্যায়ঃ ০২)



একটু পিছন থেকে যমযম কূপের একটা ঘটনা শুনে আসি;

ইয়েমেনে জুরহুম গোত্রের বসবাস ছিল । সেখানে দুর্ভিক্ষের কারনে বনী জুরহুম রোজগারের সন্ধানে বের হয়। ঘুরতে ঘুরতে তারা যমযম কূপের সামনে এসে হযরত ইসমাঈল আলিহিস সালাম ও তাঁর মা হযরত হাজেরা আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায় । বনী জরহুম এখানে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং কিছুদিন পর ইসমাঈল (আঃ) এর সাথে জরহুম গোত্রের এক মেয়ের বিয়ে হয় ।
১৩০ বছর বয়সে তিনি ইনতেকাল করলে ওসীয়ত অনুযায়ী তাঁর পুত্র কায়দার কা’বা ঘরের দায়িত্ব পান। এভাবে বংশ পরম্পরায় দায়িত্ব পাল্টাতে থাকে। দীর্ঘকাল পর বনী জরহুম এবং ইসমাঈল (আঃ) এর বংশধরের সাথে ঝামেলা হলে জরহুমরা শাসন করা শুরু করে এবং স্থানীয় আরবদের নির্যাতন করতে থাকে।

জরহুমের অন্যায় অত্যাচার এবং বিশেষ করে কা’বার অসম্মান করার কারনে আশেপাশের আরব গোত্ররা তাদের বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়ায় এবং তাদের মক্কা থেকে বিতারিত করে। জরহুমরাও যাবার সময় কা’বা ঘরের অনেক মূল্যবান দ্রব্যাদি জমজম কূপে ফেলে দেয় এবং মাটি ভরাট করে বন্ধ করে দেয়। যমযম কূপের মুখ আর দেখা যায় না।

আবদুল মুত্তালিবের সময় যমযমের নাম নিশানা ছিল না। কেউ জানত না এরকম একটা কূপ ছিল। আবদুল মুত্তালিব টানা তিনদিন স্বপ্ন দেখলেন এক লোক যথাক্রমে তাকে এসে বলছে, ‘কূপটি খনন কর’; ‘মাযনূনা খনন কর’; পবিত্র স্থান খনন কর’ । কিন্তু, তাঁর কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আবার চলে যাচ্ছে। চতুর্থ দিন এসে বলল,
‘যমযম খনন কর’।

আবদুল মুত্তালিব জিজ্ঞেস করলেন যমযম কি? লোকটি উত্তর দিল, ‘এটি পানির একটি কূপ, যার পানি কখনো নষ্টও হয় না আর কমেও না। অসংখ্যা হাজীর পিপাসা নিবৃত্ত করে’।

আবদুল মুত্তালিব সেই লোকের নির্দেশনা মতন জায়গায় গিয়ে খনন শুরু করল। খনন কাজে কুরাইশদের সাহায্য চাইলে তারা বিরোধিতা করল। সাহসী যুবক আবদুল মুত্তালিব তাঁর ছেলে হারিসকে নিয়ে খনন শুরু করলেন। বাপ মাটি খুড়ে, ছেলে মাটি সড়াতে থাকে। যখন যমযমের পানি দেখা গেল, আবদুল মুত্তালিব চিৎকার করে বলে উঠলেন

‘আল্লাহু আকবর। এটাই ইসমাঈল (আঃ) এর কূপ”।

যমযমের কূপে কিছু হাউজ নির্মান করা হল, হাজীরা পানি পান করত এবং সংগ্রহ করত। কিন্তু, সমাজের কিছু ফাজিল রাতের বেলা এসে কূপে গোসল করে কূপের পানি নোংরা করত। আবদুল মুত্তালিব আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন এবং স্বপ্নে পাওয়া দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি এই কূপে লোকদের গোসলের অনুমতি দিই না, পান করার অনুমতি দিই’। এরপরে আজব ঘটনা শুরু হল মক্কায়। যারা হাউজ নষ্ট করত তারা কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে যেত। সবার মনে ভয় ঢুকে গেল, কেউ আর যমযমের পানি নষ্ট করে না।

এদিকে যমযম খনন করার সময় আবদুল মুত্তালিব আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিল তাঁর যেন দশটি পূত্র সন্তান হয়, সেই সন্তানরা যুবক হলে যেন তাঁর শক্তি বেড়ে যায়। এরকম হলে তিনি সেই দশটি পূত্র থেকে একজনকে আল্লাহর নামে কোরবানী দিবেন । দোয়াটা মনে হয় মনেপ্রানে করেছিলেন তিনি, আল্লাহ দোয়া কবুল করে ফেললেন। দশ পূত্র যুবক হলে তিনিও নিজেকে সার্বিকভাবে শক্তিশালী অনুভব করলেন। এরকম একদিন কা’বাঘরের সামনে ঘুমিয়ে থাকার সময় স্বপ্ন দেখেন।

‘হে আবদুল মুত্তালিব। এ ঘরের মালিকের উদ্দেশ্যে তোমার মান্নত পূর্ণ করো” ।

আবদুল মুত্তালিব সব ছেলেকে ডেকে সব জানালেন। ছেলেরাও সব রাজী, কোন সমস্যা নাই। সিদ্ধান্ত হল লটারী করা হবে। লটারীতে উঠল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সন্তানের নাম- আবদুল্লাহ। এদিকে 
আবদুল্লাহর বোনেরা কান্নাকাটি শুরু করল, তাদের কথা হল দরকার হলে দশটি উটের সাথে তাদের ভাইয়ের নাম লটারি করা হোক । তখনকার সময় হত্যার বিনিময়ে দশটি উট নির্ধারন করা যেত।
দশটি উট করে দশ বার লটারি হল দশবারই আবদুল্লাহ এর নাম উঠল। ভয়ংকর ব্যাপার।

এগারোবারের সময় লটারিতে উটের নাম উঠল এবং সবাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করার পর, আবদুল মুত্তালিব সাফা মারওয়া পাহাড়ে একশটি উট কুরবানী দিলেন। আবদুল্লাহ এর এই কথা যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন কুরাইশরা তাকে অন্যরকম সম্মানের চোখে দেখত। এমনও হত, আরবে বৃষ্টি হচ্ছেনা, দুর্ভিক্ষ বাড়ছে তখন কুরাইশরা আবদুল্লাহকে সাবীর পাহাড়ে নিয়ে যেত আর তাঁর উসিলায় বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতেন।

আবদুল মুত্তালিব সিদ্ধান্ত নিলেন আবদুল্লাহকে বিয়ে দেয়া প্রয়োজন। তখনকার বনী যোগরা গোত্র বংশীয় হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। সেই গোত্রের মেয়ে ছিল আমিনা যার লালন পালন তাঁর চাচা করেন। আবদুল্লাহর চেহারায় নবুয়াতের নূর দেখা যেত। সেই নূর দেখে অনেক গোত্রই চেয়েছিলেন তাঁর সাথে সম্পর্ক করতে।

একবার আবদুল্লাহ বানিজ্য উপলক্ষে সিরিয়া যান। পথে অসুস্থ হলে মদীয়নায় যাত্রাবিরতি করেন। বানিজ্য কাফেলা যখন মক্কা ফিরে আসে তখন আবদুল মুত্তালিব জানলেন আবদুল্লাহ এখনো মদীনায়। তিনি তাঁর পূত্র হারিসকে পাঠালেন এবং খবর পেলেন দীর্ঘ একমাস অসুস্থ থাকার পর আবদুল্লাহ ইনতেকাল করেন। এই আবদুল্লাহ আমাদের প্রিয় নবীর বাবা। আর যখন তিনি ইনতেকাল করেন তখন প্রিয় নবী মাতৃগর্বে ছিলেন।

দুনিয়া অপেক্ষায় ছিল সেই রাতের, যেই রাতে তিনি জন্মেছিলেন (সুবহে সাদিকের সময়)
 

Best Blog in Bangladesh

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ