সকালে ঘুম চোখ নিয়ে কেন জানি পুরানো মেসেজ দেখার সখ জাগল। সেই পুরানো দিনের গল্প। সারারাত প্রেম হয়েছিল সেদিন। তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবনা, সারাজীবন তোমার বুকেই থাকব বলে ঘুমিয়েছিল সেই রাতে। আমার বুকেই। সকাল থেকে আর খুঁজে পাইনি;
আমাকে রেখে চলে গেছে
খুব বিশ্বাস করতাম তাকে। সেই বিশ্বাস আগেও ভেঙেছিল। ক্ষমা করেছি।কিন্তু এবার যা করল বরাবর ক্ষমা করা যায়না। আমি সেই বিশ্বাস ভাঙা মেয়েকে ছেড়ে চলে এসেছি। সে খুব নির্লিপ্তি ছিল।কোন অপরাধবোধ ছিলনা। বিশ্বাস ভেঙে ধরা খাবার কোন লজ্জা ছিল না। শুধু দুই অক্ষরেরর একটা কথাই বলেছিল।
আচ্ছা
আমি তার সাথে কাটানো সময় ভুলতে চাই,পারিনি। কখনো তার পুরানো মেসেজ ডিলিট করা হয়নি। প্রচণ্ড ব্যস্ততা নিয়ে নিজেকে যান্ত্রিক করে ফেললেও খুব ভোরে কিংবা মধ্য রাতে যখন ঘুম ভেঙে নিজের চোখে পানি উপলদ্ধী করি, তখন মেয়েটার ছবি দেখি, পুরানা মেসেজ পড়ি। ঠিক তখনি মনে হয় কেন বেচে আছি আমি। বেচে থাকার অর্থ কি?
তখনি আত্বহত্যার সিদ্ধান্ত নিই
আমি সব কাজ ফেলে প্রায় একা ঘরে আয়োজন করে আত্বহত্যার আয়োজন করি। ফ্যনের উপর আড়াআড়ি করে দড়ি বেধে নিচে গোল করে রাখা দড়ির দেকে তাকিয়ে থাকি। এখানে মাথাটা ঢুকলেই কি শেষ সব? তখন কি আর কষ্ট জিনিসটা থাকবে না? প্রায় হাতে ব্লেড নিয়ে বাম হাতের রগ ফুলিয়ে বসে থাকি। জোরে একটা টান দিলেই কি আমি সব কষ্ট থেকে বেচে যাব?
আসলেই কি সমাধান হয়?
আমি প্রচণ্ড ভীতু প্রকৃতির মানুষ। মৃত মানুষের চেহারা দেখিনা ভয়ে। খুব রাত হলে একা ঘর ছেড়ে বের হইনা ভয়ে। কোথাও জটলা দেখলে বুক ধড়ফড় করে উঠে, এই বুঝি আমার কোন বিপদ হচ্ছে। আমি অনেক সিগারেট খাই প্রতিদিন, কখনো গাজা নিয়ে বসা হয়নি।গাজা খেলে নাকি সাময়িক সব ভুলে থাকা যায়। ভয়ের কারনে তাও পারিনি। আমার বোধহয় আত্বহত্যার কোন সুযোগ নেই। ভীতু মানুষেরা এমনিই হয়।তাইনা?
বেচে থাকাও যায়না, মরতেও পারেনা।।
একটানা কথাগুলো বলেই ছেলেটা থামল। এখন কি নিঃশ্বাস নেবার বিরতি চলছে নাকি তার কথা শেষ। আমি সময় নিচ্ছি। দেখা যাক আর কিছু বলে কিনা। ছেলেটা ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কালো ঠোট চেহারার সাথে মানানসই না। বুঝা যায় প্রতিদিন প্রচুর সিগারেট খেয়ে কলিজার যন্ত্রণা নষ্ট করার অপচেষ্টা করে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস বলে দিচ্ছে শরীরটা ভেঙে দিয়েছে মানসিক যন্ত্রণা।
-আমার কথা শেষ।।
নাহ, ছেলেটার সব কথা শেষ হয়নি। সে প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় আছে সেটাই বুঝিয়েছে, কেন সেই যন্ত্রণা তা জানাতে চায়নি। বুঝা যায় মেয়েটাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। তাই তার করা অপরাধগুলো অন্যদের কাছে আড়াল করে নিচ্ছে। আমি নিজে থেকে জানতে চাইনি আর। ছেলেটা ভিতু, চেহারাই বলে দিচ্ছে;
ভালো টাইপ ভিতু মানুষ।।
হুট করে একটা দীর্ঘশ্বাষ নিল ছেলেটি। আমি আরেকটা দীর্ঘশ্বাস নিয়েই শুরু করলাম।
-তুমি আমাকে যে গল্প বলেছ তাতে আমার দুই মিনিট সময় কেটেছে মাত্র। কিন্তু তোমার বুক থেকে দুই কেজি ওজনের পাথর সরে গেছে। কখনো খুব বেশি কষ্ট পেলে একা আগলে রাখা অপরাধ, নিজেকে নষ্ট করার মতন অপরাধ। তোমার কষ্টকে তুমি অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছ। সেই উচ্চতায় শুধু আত্বহত্যা দেখা যায়, নতুন জীবন ভাবা যায়না।
তোমার গল্প সম্পূর্ণ না। তাই তোমার কয়েকলাইন শুনেছি আমি, শ্রবণ করা ছাড়া এরবেশি কিছু করা সম্ভব না। তোমার গল্প বাদ। এরচেয়ে ভাল আমার গল্প শুন।
জঞ্জাল ফেলে আসার গল্প
তোমার মতন কাউকে খুব বিশ্বাস করেছি। মানুষ এর একটা স্থায়ী রোগ হল এরা বিশ্বাস ভাঙবেই। এদের সোনা রুপার পানি দিয়ে প্রতিদিন গোসল করালেও এরা কখনো না কখনো বিশ্বাস ভাঙবে। আমার বিশ্বাস যেদিন ভাঙে সেদিন আমি মতিজিলের রাস্তায় রাত গভীর পর্যন্ত কেঁদেছি। পাথরের শাপলাচত্বর আমার জন্যে কেঁদেছিল সেদিন। প্রায় খিলগাঁও রেলগেট দিয়ে রেল লাইনকে মরণ সংগী করে হাটতাম। পিছন থেকে ভারী লোহার গাড়ীর কু' শব্দের কান্না আমাকে পিষে ফেলতে দেয়নি।
জড় পদার্থরাও কথা বলতে জানে
শুধু তোমাকে সেই কথা শুনতে হয়, বুঝতে হয়। আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন টেম্পু করে এক সকালে গ্রামে যাওয়া হচ্ছিল মায়ের সাথে। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে যখন টেম্পুর ভিতরে পানি আসছিল তখন সবাই ভিজে গিয়েছিল। আম্মা, আব্বু সবাই ভিজল, শুধু আমি ছাড়া। আমাকে তখন চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল আম্মার বুকে।
এরচেয়ে বড় ভালোবাসার অনুভূতি হয়না।
অসুখ হলে রাতভর সেই মা জেগে থাকত পাশে। আমি বোধহয় আরাম করে ঘুমাতাম, কিন্তু আমার শরীরের সব যন্ত্রনা নিয়ে মানুষটা রাত জেগে থাকত। আব্বু প্রতি পরিক্ষ্যার রাতে নামাজ পড়তেন আর কাঁদতেন। সকালে ঘুম চোখ নিয়ে আমার নতুন আবদার সাইকেল কিনতে বের হতেন। উনার নিজের সখ ছিল বলে জানা নেই আমার।
জানাটা প্রয়োজন
আমি যেই ভালোবাসা বলে কেঁদে কেঁদে রেললাইনকে ভিজিয়েছিলাম, সেই ভালোবাসা আমার ছিল না। আমার জন্যে এরচেয়ে বড় ভালোবাসা খোদা আগেই দিয়েছেন।
পরিবার
এখন কষ্ট হলেই বাড়ি গিয়ে ভাইয়াদের সাথে গল্প করি। আব্বুর সাথে উনার পিচ্ছিকালের দুষ্টামির কাহানী শুনি। আম্মার ঐতিহাসিক আফসোস 'ছেলে শুকায় গেছে', 'ছেলে রোগা হয় গেছে' টাইপ আদর শুনে আসি। ভাতিজিদের পটরপটর আবদার নিয়ে আইসক্রিম খেতে বের হয়ে যাই শহরে;
সুখি মানুষের গল্প
তোমার নিশ্চয় এমন পরিবার আছে। খেয়াল করে দেখ মা কেমন ভালোবাসা দিয়েছিল। বাবা তোমার সখ নিয়ে দৌড়েছিল। মনে পড়ছে না?
-হ্যা
তাহলে মনে হয়না তোমার আর মৃত্যুর দরকার আছে। এরপরেও যদি আত্বহত্যা করতে হয়, তবে নরমাল দড়ি ব্যাবহার না করার পরামর্শ দিব। লাইলন সুতা নিবে গুলিস্তান বাবু বাজার থেকে। এই সুতা শক্ত, চিকন। মৃত্য নিশ্চিত। তোমার পরিবারের ভালোবাসার চেয়ে বিশ্বাস ভেঙে চলে যাওয়া কোন মানবীর ভালোবাসা বেশি হলে, তোমাকে বেচে থাকার জন্যে কোন পরামর্শ আমার কাছে নেই আর। আমি এখন আলু ডিম ভাজি করব, কড়া করে ভাজি করে ভাত খাব। কথা বলার ইচ্ছে নেই;
তুমি যেতে পার
ছেলেটা চলে গেল। যাবার আগে তার ঠোঁটে চিলতে হাসি দেখেছিলাম। এই ছেলে এই যাত্রায় বেচে গেছে। পরিবারের ভালোবাসার মর্ম হয়ত উপলদ্ধী করতে পেরেছে। হয়ত এখুনি বাসায় গিয়ে মাকে জড়িয়ে বলবে ডিম, আলু ভর্তা দিয়ে গরম ভাত খাব। আলু ভর্তায় সরিষার তেল দিবে, যেন নাকে ঝাঝ লাগে। পোড়া মরিচ কচলায় দিবা। ডিমের কুসুমে হালকা বিট লবন দিও। খিদা লাগছে, তাড়াতাড়ি।
ছেলেটা সেই রাতেই মারা গেল
ভীতু ছেলেটার গলায় দেয়া দড়িটা লাইলনের ছিল কিনা জানা হয়নি, জানার চেষ্টা করিনি। মৃত মানুষের গল্প অজানা থাকে। ভালোবাসা অদ্ভুত, এরা যুক্তি মানে না। একবার আবেগে ধরলেই হল, পৃথীবির কোন যুক্তি এদের সান্তনা দিতে পারেনা। ভালোবাসা আসলেই অদ্ভুত,
ভালোবাসা আসলেই নিষ্ঠুর
Best Blog in Bangladesh

0 মন্তব্যসমূহ